বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৬ ঘন্টা আগে, ১২:২৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

পটুয়াখালীর খামারে উৎপাদিত কোটি টাকার সাপের বিষ, বাজারজাতে নেই সুযোগ

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রতিবছর সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ দেশের মাটিতেই উৎপাদিত কোটি টাকার সাপের বিষ (ভেনম) বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকারি নিবন্ধন পেলেও নীতিগত জটিলতা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে পটুয়াখালীর একটি সাপের খামারে উৎপাদিত ভেনম অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ নামে একটি সাপের খামার। দীর্ঘ ২৬ বছরের প্রচেষ্টার পর সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে খামারটি নিবন্ধন পেয়েছে। এর মাধ্যমে বৈধভাবে বিষধর সাপ পালন ও ভেনম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হলেও উৎপাদিত ভেনম এখনো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যোক্তার বাড়ির সামনেই গড়ে তোলা হয়েছে খামারটি। নিরাপদ খাঁচায় সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। প্রতিটি খাঁচায় সাপের প্রজাতির নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ রয়েছে। কর্মীরা নিয়মিত সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন।

খামারটিতে বর্তমানে কিং কোবরা, রাসেলস ভাইপার, সাদা গোখরা, পদ্ম গোখরা, কেউটে, পাইথন, পঙ্খীরাজ, দাঁড়াশ, বাসুয়া, বিষঝুড়ি, গোঁড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে।

উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, প্রবাস জীবন শেষে ২০০০ সালে শখের বসে সাপ পালন শুরু করেন তিনি। পরে আহত ও লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপ উদ্ধার করে সংরক্ষণ এবং বংশবিস্তার কার্যক্রম শুরু করেন। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগের পর অবশেষে খামারটির নিবন্ধন মিললেও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা এখনো পাননি।

তিনি বলেন, ‘২৬ বছর ধরে নিজের সঞ্চয় ব্যয় করে খামারটি গড়ে তুলেছি। ইতোমধ্যে এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। জমি বিক্রি করতে হয়েছে, এমনকি স্ত্রীর গহনাও বিক্রি করেছি। এখন আর্থিক সংকটে খামার পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

রাজ্জাক বিশ্বাসের দাবি, তার খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড ভেনম সংগ্রহ করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় আট কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব। নিবন্ধন পাওয়ার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো ওষুধ কোম্পানি এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

তিনি বলেন, ‘দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

খামারের কর্মী হৃদয় জানান, আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বেতনও পান না তারা। তবুও খামারটি টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খামার গড়ে তোলা সহজ নয়। এ উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এ বিষয়ে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করার পরই ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন সম্ভব হলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ ও কার্যকর হবে। এ জন্য সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাধারা/শারমিন
 

মন্তব্য করুন