প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ও অব্যাহত বৃষ্টিপাতে মেঘনার পানির চাপ বৃদ্ধিসহ তীব্র স্রোতে ভোলা শহর রক্ষা বাঁধের ইলিশা অংশের বহু এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ইলিশা লঞ্চঘাট এলাকায় সিসি ব্লক ধসে গেছে। অব্যাহত ভাঙনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে ভোলা শহর রক্ষাবাঁধ।
গতকাল রোববার সরেজমিন ইলিশা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভাঙনের তীব্রতা। সেখানকার ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও মাছঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে ইলিশা লঞ্চ ঘাটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কার্যক্রম। ফলে দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভাঙন ছড়িয়ে পড়তে পারে ভোলা শহর রক্ষা বাঁধের বিস্তীর্ণ আরো নতুন নতুন জনপদ। ভাঙনের শিকার ইলিশা এলাকার নদীর তীরবর্তী বাঁধের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো মূহুর্তে তারা নিজেদের ঘর-বাড়ি নদীর পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছেন।
ভোলা সদর উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত সব চেয়ে ব্যস্ততম লঞ্চ ও ফেরিঘাট হচ্ছে-ইলিশা। এখান থেকে প্রতিদিন ১৫-২০টি লঞ্চে কয়েক হাজার যাত্রী ভোলা-ঢাকা ও ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নৌ-পথে চলাচল করে। কিন্তু মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক পানির চাপ ও স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১৪ জুলাই ভোররাত থেকে সদর উপজেলার ইলিশা লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয় সিসি ব্লকের ধস। গত কয়েক দিনে উজানের পানির চাপে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চার স্তরের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার শত শত সিসি ব্লক। মেঘনার তীব্র স্রোত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে সিসি ব্লক ধ্বসের মাত্রাও। ইতোমধ্যে আরও প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে; যা নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইলিশা লঞ্চ ও ফেরিঘাটের হোটেল মালিক মো. শাহজাহান, পান দোকানী আলাউদ্দিন, মুদি ব্যবসায়ী মো.আনোয়ার হোসেন এবং স্টেশনারি দোকানদার পরিমল বাবুসহ সেখানকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা হয়। তাদের সকলের মুখে একই কথা।
তারা বলেন, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে আমাদের সব কুল হারিয়ে পরিবার নিয়ে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায়ন্তর থাকবে না। তারা ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি দাবি জানান।
এদিকে, ব্লক ধসের কারণে ঢাকা ইলিশা লঞ্চঘাটের পন্টুন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে এরই মধ্যে এ লঞ্চ ঘাটে যাত্রী উঠানামা বন্ধ ঘোষণা করে ঘাটটি সরিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা।
ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদার লুকু চৌধুরী বাসস’কে জানান, লঞ্চঘাটের জায়গা নদীতে বিলীন হওয়ায় এখন ঘাটে লঞ্চ ভিড়তে পারছেনা; ফলে একদিকে যাত্রীরা যেমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তেমনি আমরাও লোকসানের ঘানি টানছি।
অন্যদিকে, ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘাট এলাকায়। ঝুঁকিতে থাকা দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভাঙনের ফলে বেড়িবাঁধের বাহিরে থাকা ইলিশা, রাজাপুর ও কাঁচিয়াসহ তিন ইউনিয়নের হাজারো মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তথ্য অনুযায়ী, ইলিশা লঞ্চঘাট এলাকা ভোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এখানেই রয়েছে জেলার প্রধান ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, মাছঘাট এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। ভাঙন অব্যাহত থাকলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নদীর তীরবর্তী বসতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ভোলা আঞ্চলিক বন্দর কর্মকর্তা নির্মল কুমার রায়ের সাথে।
তিনি বাসস’কে বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অফিসিয়ালি বিষয়টি অবহিত করেছি। তাদের নির্দেশে গতকাল রোববার সকালেই ভাঙন এলাকা হতে পন্টুনগুলো অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেগুলো যথাযথভাবে স্থাপন ও সংস্করণের কাজ চলছে।
ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরিভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হবে বলে বাসস’কে জানিয়েছেন-ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দীন আরিফ।
ইলিশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও স্থানীয় গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু নোমান বাসস’কে বলেন, এর আগে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একাধিকবার একই পয়েন্টে সিসি ব্লকের ধস দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ভাঙন ছড়িয়ে পড়তে পারে ভোলা শহর রক্ষা বাঁধের সব পয়েন্টেই। তাই সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন