প্রকাশিত: ১৬ ঘন্টা আগে, ০৫:০৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক হলেও কৃষির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে মাথায় রেখে বাড়ির আঙিনায় আমগাছ রোপণ শুরু করেছিলেন শিক্ষক মোশাররফ হোসাইন (৪৫)। রাসায়নিকমুক্ত ও নিরাপদ আম উৎপাদনের লক্ষে কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ এখন শতাধিক আমগাছের সমৃদ্ধ বাগানে পরিণত হয়েছে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের কর্পূরকাঠি গ্রামের শিক্ষক মোশাররফ বর্তমানে উন্নত জাতের নিরাপদ আম উৎপাদন করে স্থানীয়ভাবে প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি অন্যদেরও ফলচাষে উদ্বুদ্ধ করছেন।
মোশাররফ হোসাইন বাসস’কে বলেন, ২০১৮ সালে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে উন্নত জাতের বেশ কয়েকটি আমের চারা সংগ্রহ করে তিনি বাড়ির আঙিনায় ২০টি গাছ রোপণ করেন। শুরুতে বিষয়টি ছিল নিছক শখের। পরে বাড়ি সংলগ্ন খালি জমিতে তিনি বড় আঙিনাকে আমের বাগান শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিয়মিত পরিচর্যা, কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং নিজের আগ্রহের ফলে ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, প্রথম বছর কোনো ফল না পেলেও পরের বছর থেকেই গাছে বেশ ভালো পরিমাণে ফল আসতে শুরু করে। কৃষি বিভাগের দেওয়া বারি-৩ ও বারি-৪ জাতের চারা ভালোভাবে পরিচর্যা করায় প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন পাওয়া যায়। এরপর কলম ও নতুন চারা রোপণের মাধ্যমে তিনি বাগান আরও সম্প্রসারণ করেন।
বর্তমানে তার বাগানে শতাধিক আমগাছ রয়েছে। বারি-১১, ফজলি, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, চ্যাংমাইসহ ৭ থেকে ৮টি উন্নত জাতের আমের চাষ করছেন তিনি। এ বছর বাগানে অধিক ফলন হওয়ায় পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারেও আম বিক্রি করছেন।
মোশাররফ জানান, জাতভেদে প্রতি কেজি আম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মন আম বিক্রির আশা করছেন তিনি। তার দাবি, রাসায়নিকমুক্ত ও নিরাপদ হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এসব আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও গুরুত্ব দেন এ শিক্ষক। প্রতিবছর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে তিনি তার বাগানে উৎপাদিত আম উপহার দেন। এতে তার বাগান এলাকায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যেরও একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শিক্ষক মোশাররফের সাফল্য অনেকের মধ্যে ফলচাষের আগ্রহ তৈরি করেছে। তার বাগান দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন এবং আম চাষ ও পরিচর্যা বিষয়ে পরামর্শ নেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাসনাইন বলেন, আগে কেউ ভাবেননি বাড়ির আঙিনায় এত বড় পরিসরে লাভজনক আম চাষ সম্ভব। এখন মোশাররফ স্যারের সাফল্য দেখে আশপাশের এলাকার অনেকেই নতুন করে বাগান গড়ে তুলছেন।
আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, তিনি শুধু আম বিক্রি করেন না, প্রতিবছর আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীদেরও আম উপহার দেন। তার উৎপাদিত আমের স্বাদ ও মান এলাকার মানুষের কাছে ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছে।
মোশাররফ হোসাইন বলেন, কৃষি উদ্যোক্তাদের সফল হতে সব সময় আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয় না। বরং সময়মতো কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সহযোগিতা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে আমের মাছি পোকাসহ বিভিন্ন রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি জানান, তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেকেই আম চাষ শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে কালাইয়া গ্রামের মিরন সিকদার উল্লেখযোগ্য। কয়েক বছর আগে তার পরামর্শে আমগাছ রোপণ করে বর্তমানে তিনিও ভালো ফলন পাচ্ছেন।
মিরন সিকদার বলেন, মোশাররফ স্যারের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে তিনি বাগান গড়ে তুলেছেন। সঠিক পরিচর্যা করলে বাড়ির আঙিনাতেও লাভজনকভাবে উন্নত জাতের আম চাষ করা সম্ভব, তা মোশাররফ স্যার প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
কালাইয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফিরোজ হাওলাদার বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিতে মোশাররফের সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। আমের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছেন।
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বাসস’কে বলেন, কৃষি বিভাগ নিরাপদ ফল উৎপাদন ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে নিয়মিত কাজ করছে। মোশাররফ হোসাইনের মতো উদ্যোগী ব্যক্তিরা অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, শখ থেকে শুরু হওয়া একটি ছোট উদ্যোগ পরিকল্পনা, পরিচর্যা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কীভাবে সফল উদ্যোক্তায় রূপ নিতে পারে, মোশাররফ হোসাইন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার এ সাফল্য নিরাপদ ফল উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বাসস’কে বলেন, শিক্ষক মোশাররফ হোসাইনের মতো উদ্যোগী ব্যক্তিরা সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কৃষিতে তার সফলতা অন্যদেরও ফল চাষে আগ্রহী করে তুলছে। উপজেলা প্রশাসন কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম চলমান থাকবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিরাপদ ফল উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন