প্রকাশিত: ২৩ ঘন্টা আগে, ০৮:১৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে তিনটি নতুন কূপ খনন করবে বাপেক্স

ছবি: সংগৃহিত

স্থানীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মূল্যায়ন-উন্নয়ন (অ্যাপ্রেইজাল-কাম-ডেভেলপমেন্ট) কূপ এবং দুটি অনুসন্ধানমূলক (এক্সপ্লোরেটরি) কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘একটি মূল্যায়ন-উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫) এবং দুটি অনুসন্ধানমূলক কূপ (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্রা-২) খনন’ শীর্ষক এ প্রকল্পটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) বাস্তবায়ন করবে।
আগামী বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির খসড়া অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বাসসকে বলেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মোট ১৫০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, যেকোনো কূপ খননের আগে পেট্রোবাংলা ২ডি, ৩ডি ভূকম্পন জরিপসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি কাজ সম্পন্ন করে। সরকারের এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনটি কূপ খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব একনেকের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ৫৮৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং বাপেক্স নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রস্তাবিত কূপগুলো সফলভাবে খনন করা গেলে এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফিট (এমএমএসসিএফ) গ্যাস যুক্ত হবে।’
তিনি জানান, কারিগরি মূল্যায়ন অনুযায়ী তিনটি কূপ থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭১১ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত পাওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমদানিকৃত এলএনজির সমমূল্যে এ গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এটি একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে।’
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরতায় বেগমগঞ্জ-৫ মূল্যায়ন-উন্নয়ন কূপ, ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতায় বেগমগঞ্জ-৬ অনুসন্ধান কূপ এবং ৫ হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় সুনেত্রা-২ অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে। গ্যাসের সন্ধান মিললে পরীক্ষণ ও কূপ সম্পন্ন করার কাজও করা হবে।
বেগমগঞ্জের দুটি কূপ নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায় এবং সুনেত্রা-২ কূপ সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায় খনন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ২ডি ও ৩ডি ভূকম্পন জরিপসহ ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের পর বাপেক্স প্রকল্পটি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
তারা বলেন, ‘সিসমিক ডাটা ও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক তথ্য পর্যালোচনার পর ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-পদার্থগত (জি অ্যান্ড জি) কমিটি প্রস্তাবিত খনন স্থানগুলো চূড়ান্ত করেছে।’
কর্মকর্তারা বলেন, বেগমগঞ্জ কাঠামো ইতোমধ্যে সম্ভাবনাময় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে বেগমগঞ্জ-৩ ও বেগমগঞ্জ-৪ কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১১ দশমিক ৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে, যা নতুন কূপগুলোর সাফল্যের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। 
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ দশমিক ৬১ একর জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, রিগ ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ, দেশি-বিদেশি ড্রিলিং সরঞ্জাম ও উপকরণ সংগ্রহ, বেগমগঞ্জের কূপগুলোতে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ব্যবহার করে খনন এবং গভীর সুনেত্রা-২ কূপ টার্নকি ভিত্তিতে খনন কাজ করা হবে।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ২০২৫ সালে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণও বাস্তবায়নের পক্ষে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেটের ভিত্তিতে প্রকল্পটির আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ১৪ শতাংশ, অর্থনৈতিক আইআরআর ২০ শতাংশ এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও আর্থিকভাবে ১ দশমিক ০৯ ও অর্থনৈতিকভাবে ১ দশমিক ৫০ নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাপেক্সের অনুসন্ধান সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, দেশীয় গ্যাসের মজুত বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করা এবং স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, এ উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-৭.১ অর্জনেও সহায়ক হবে, যার লক্ষ্য সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, প্রকল্পটি আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন