প্রকাশিত: ১৬ ঘন্টা আগে, ১০:১১ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানায় কমেছে উৎপাদন, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহে, বেড়েছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে গ্যাস সংকটে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের জনজীবন, পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের শুরুতে এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় আবাসিক ও শিল্প দুই খাতেই সংকট তীব্র হয়েছে।
নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার রান্না করতে হচ্ছে বিকেল বা গভীর রাতে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে প্রতিদিন হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পরিবারের খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে যাওয়ায় দুপুরে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের নিয়মিত হোটেলের খাবার খাওয়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, গ্যাসের তীব্র সংকটে নাকাল সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকরাও। বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নেওয়া যেত। এখন চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হচ্ছে, যাত্রী পরিবহন করে আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে চট্টগ্রামের শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে।
এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ও পণ্য সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আদেশ, পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপর।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী। এখানকার গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে লোডশেডিং। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে একদিকে গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি সেই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের ওপর তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ।
জানা গেছে, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
জাতীয় গ্রিডে সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত গ্যাসের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকার চাহিদা মেটাতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে চট্টগ্রামে সরবরাহ আরও কমে গিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ১ আগস্ট দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও উল্টো সংকট আরও বেড়েছে। গ্যাসের প্রেসার ও ফ্লো কম থাকায় পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। সংকট মোকাবিলায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে।
ফলে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট আরও কতটা দীর্ঘ হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন