বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৫:৩৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মোবাইলে বিয়ে, সংসার শুরুর আগেই রিয়াদের আগুনে শেষ সাব্বিরের স্বপ্ন

ছবি: সংগৃহীত

মোবাইল ফোনে বিয়ে। এরপর কেটে গেছে আড়াই বছর। স্বামী-স্ত্রীর দেখা হয়নি একবারও। ভিডিও কল আর মুঠোফোনের কথোপকথনেই চলছিল তাদের দাম্পত্যের গল্প। অপেক্ষা ছিল প্রবাস থেকে স্বামী দেশে ফিরবেন, স্ত্রীকে ঘরে তুলে শুরু হবে নতুন সংসার। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো ঠিকই, ফিরলেন সাব্বির, তবে জীবিত নয়, নিথর মরদেহ হয়ে।

সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার প্রবাসী যুবক সাব্বির হোসেন শুভ (৩০)। সংসার শুরুর আগেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে স্ত্রীকে নিয়ে তার সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ছুটে এসেছেন নববধূ। অথচ বিয়ের আড়াই বছর পরও স্বামীকে একবার চোখের দেখাও দেখতে পারেননি তিনি। এখন স্বামীর সঙ্গে ঘর বাঁধার বদলে অপেক্ষা করছেন তার লাশ দেশে ফেরার।

সাব্বিরের বাড়ি নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরাশ্রীপুর পাড়ায়। রিয়াদের অগ্নিকাণ্ডের খবর আসার পর থেকেই সেখানে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা-মা। অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন সাব্বিরের স্ত্রী।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবারের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সাব্বির। বাবা গোলাম রাব্বানী ও মা সাবিনা বেগমের একমাত্র ছেলে ছিলেন তিনি। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে একদিকে পরিবারের ঋণ পরিশোধ করছিলেন, অন্যদিকে বাড়ির অসমাপ্ত নির্মাণকাজও এগিয়ে নিচ্ছিলেন।

এরই মধ্যে প্রায় আড়াই বছর আগে পারিবারিকভাবে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এক তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। প্রবাসে থাকা সাব্বিরের সঙ্গে মোবাইল ফোনেই সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। বিয়ের পরও তাদের দাম্পত্যজীবন ছিল অনেকটা দূরত্বের মধ্যে বন্দী। ভিডিও কল আর ফোনালাপই ছিল তাদের একে অপরকে কাছে পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম।

স্বপ্ন ছিল, একদিন দেশে ফিরবেন সাব্বির। স্ত্রীকে ঘরে তুলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবেন তাদের সংসার। পরিবারের সদস্যরাও সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলেন। পরিকল্পনা ছিল আগামী রোজার ঈদে দেশে ফিরবেন তিনি। ছোট বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। এরপর স্ত্রীকে ঘরে তুলে শুরু করবেন নিজের সংসার।

কিন্তু রিয়াদের একটি অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই সব স্বপ্ন শেষ করে দিল।

গত রোববার (৯ আগস্ট) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাব্বিরসহ ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার শামীম আহমেদ ও রবিউল ইসলাম নামের আরও দুই যুবক রয়েছেন।

সাব্বিরের চাচাতো বোন সেলিনা খাতুন বলেন, ‘ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ভাবি বাড়িতে এসেছে। কিন্তু তখন আমার ভাই আর জীবিত নেই। ভাই আর ভাবিকে একসঙ্গে জীবিত দেখতে পারলাম না।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাব্বির। তার উপার্জনে ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা কমছিল। বাড়ির অসমাপ্ত কাজও এগিয়ে চলছিল। নিজের ঘরটি পুরোপুরি শেষ না করে দেশে ফিরতে চাইতেন না তিনি। পরিবারের জন্য ভালো একটি ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই প্রবাসে দিন কাটাচ্ছিলেন এই যুবক।

সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে কিছু টাকা পরিশোধও করেছে। এখনো কয়েক লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করে ঘরের কাজ শেষ করার কথা ছিল। ঘর ঠিক না করে ছেলে বাড়িতে আসতে চাইত না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত আমার সন্তানের লাশ আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হোক।’

সাব্বিরের পরিবারে এখন আর ঈদের আনন্দের অপেক্ষা নেই, নেই নতুন সংসার শুরুর প্রস্তুতিও। যে ঘরে স্বামীকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন নববধূ, সেই ঘরেই এখন অপেক্ষা কেবল প্রিয় মানুষটির মরদেহের।

এদিকে ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান খান জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানানো হয়েছে। পরিবারের কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।

তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ দ্রুত পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে।

সাব্বিরের পরিবারের কাছে এখন সময় যেন থমকে আছে। যে ছেলে পরিবারের ঋণ শোধ করতে, অসমাপ্ত ঘর শেষ করতে এবং প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করতে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই ছেলেকেই এখন শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় তার বাবা-মা, স্ত্রী ও স্বজনরা। প্রবাসে পাড়ি জমানো হাজারো তরুণের মতো সাব্বিরও স্বপ্ন দেখেছিলেন একটু ভালো জীবনের। কিন্তু সেই স্বপ্নের শেষ অধ্যায় লেখা হলো রিয়াদের আগুনে—সংসার শুরুর আগেই।

বাংলাধারা/শারমিন

 

মন্তব্য করুন