বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৫২ মিনিট আগে, ১০:০৬ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ঢামেকে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৪২, সেপ্টেম্বরে ভর্তি ১৪০৩

ছবি; সংগৃহিত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৪২ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ১৮১ জন, আর নিজেরাই রিসবন্ড দিয়ে চলে গেছে ৫৭৯ জন। শনিবার সরেজমিনে ঘুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়,ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু ওয়ার্ড ৫০২,৪০২ ও ৭০২।এখানে রোগীদের ভর্তি করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড এই তিনটি ওয়ার্ডেই রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিনিয়ত এই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো থাকলেও তাদের স্বজনদের (অ্যাটেন্ডেন্ট) এর সংখ্যা অনেক বেশি। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক রোগীকে মশারি সরবরাহ করলেও নানা অজুহাতে তারা মশারি টানাচ্ছেন না।
গাজীপুর থেকে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিতে আসা ১৮ বছর বয়সী ফারহান জানান, “আমরা গাজীপুর থাকি সেখানে বেশ কয়েকদিন জ্বর থাকার পরে গাজীপুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম সেখান থেকে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে রেফার করে।এখন আগের থেকে একটু ভালো আছি।হাসপাতালে এসেছেন আপনাদের এখানে মশারি সাপ্লাই দেয়া হয়েছে কিন্তু আপনারা কেন মশারি টানাচ্ছেন না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,হাসপাতাল দেশের থেকে মশারি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু টানানোর ব্যবস্থা পাচ্ছিনা।”
ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন আফরোজা আক্তার নামে এক নারী।তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে জ্বরের পর ডেঙ্গু পরীক্ষা করলে পজিটিভ আসার পর ঢাকা মেডিকেলে এসে ভর্তি হয়ে। মুখে কোন কিছু খেতে পারছি না বমি হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।পরে ঢাকা মেডিকেলে স্যালাইন নেওয়া শুরু করি। আমার ১ লাখের নিচে নেমে এসেছিল। সেটার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালে ওয়াশরুম গুলা অনেক নোংরা।”
মশারি থাকতেও টানাচ্ছেন না কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভিতরে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি গরম। মশারি টানালে ভিতরে বাতাস প্রবেশ করে না। মশারি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু টানানোর ব্যবস্থা তো সেরকম দেখছি না।”
নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন জানান, “আমাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ডগুলোতে সকলকে মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তারা মশারির ব্যবহার করছেন না।এতে তাদের সাথে যারা এটেনডেন্ট রয়েছে তাদেরও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় কম। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ গত দুই বছরে ঢামেকে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২১৩ জন।
তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১২৭ জন। সেপ্টেম্বরে ভর্তি ১ হাজার ৪০৩
ঢামেকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারিতে ৪৫, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে মাসে ৭৫ এবং জুনে ১২২ জন ভর্তি হন।
জুলাই থেকে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ওই মাসে ৩৭২ জন, আগস্টে ৮৪৪ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৪০৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২৭ জন। ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬৬ জন, নিজ দায়িত্বে চলে গিয়েছেন ৩১, জন এবং ৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুইজন মারা গেছেন।
এ নিয়ে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
তিন বছরে ভর্তি ১০ হাজারের বেশি
ঢামেকের গত তিন বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে মোট ৩ হাজার ৪০৯ জন, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৮৮৮ জন এবং ২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
২০২৪ সালে জানুয়ারিতে ৬৫, ফেব্রুয়ারিতে ২৪, মার্চে ১৮, এপ্রিলে ৩৭, মে ৪৭, জুন ৬৬, জুলাই ১৪৪, আগস্ট ৩৪৬, সেপ্টেম্বরে ৭৯৪, অক্টোবরে ৮৮২, নভেম্বরে ৬৭৮ এবং ডিসেম্বরে ৩০৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন।
২০২৫ সালে জানুয়ারিতে ৭১, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২৪, এপ্রিলে ৩৫, মে ৭২, জুন ২২৯, জুলাই ৩৯৯, আগস্ট ৫৩৪, সেপ্টেম্বরে ৬৯৬, অক্টোবরে ৭৬২, নভেম্বরে ৭৭৯ এবং ডিসেম্বরে ২৬৫ জন ভর্তি হন।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জানুয়ারিতে ৪৫, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে ৭৫, জুন ১২২, জুলাই ৩৭২, আগস্ট ৮৪৪, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৪০৩ এবং অক্টোবরে ১২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর সেপ্টেম্বরে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি
ঢামেকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে কেউ মারা যাননি, মার্চে ২, এপ্রিলে কেউ মারা যাননি, মে মাসে ২, জুনে ১, জুলাইয়ে ১০, আগস্টে ১০, সেপ্টেম্বরে ১৩ এবং অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে ১০ জন করে মারা গেছেন।
২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে মোট ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়। তিন বছরের মাসভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বর্তমানে ঢামেকে ভর্তি ২৯৮ রোগী
৩ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢামেকে ডেঙ্গু নিয়ে ১২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং ৩১ জনকে ডিওআরবিতে রাখা হয়েছে।
এই সময়ে ডব্লিউ-৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বর্তমানে ঢামেকে ভর্তি রয়েছেন মোট ২৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ১৪১ জন পুরুষ, ৮৯ জন নারী এবং ৬৮ জন শিশু।
২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা বেশি আক্রান্ত
বয়সভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমায় ৮৬২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।তার পর ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৬২২ জন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৫৬৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া ০ থেকে ১০ বছর বয়সী ৩৭৫ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩২৭ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২০৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৯৪ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী ২৭ জন এবং ৮০ বছরের বেশি বয়সী ৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ৪২ জনের মধ্যে ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৯ জন, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৭ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৬ জন, ০ থেকে ১০ বছর বয়সী ৫ জন, ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৫ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৪ জন এবং ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী একজন রয়েছেন।৮০ বছরের বেশি বয়সী কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
ঢাকা মেডিকেলে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে কিনা,বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের কি অবস্থা সে বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, “ডেঙ্গু রোগী সংক্রান্ত সকল তথ্য দেওয়ার জন্য পরিচালক ডা আশরাফুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।এসব বিষয়ে তিনি সব কিছু বলতে পারবেন উপ-পরিচালক আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে  জানতে পারবেন।”
ডেঙ্গু সংক্রান্ত বিষয়ে জানার জন্য হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা আশরাফুল আলম কে একাধিকবার ফোন করলেও ফোন রিসিভ করেননি।ফোন রিসিভ না করায় তার কাছ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন