বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:১১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

৩০৪ কোটি টাকার ঋণ ‘নিষ্পত্তি’, নাকি অনিয়ম ঢাকার কৌশল?

ছবি; সংগৃহিত

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
জনতা ব্যাংকের দাবি, ঋণটি বহু পুরোনো এবং দীর্ঘ আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৩ সালেই দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ অবলোপন, হিসাবের গরমিল ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য পাওয়া গেছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান বলেন, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। তার দাবি, শেখ খলিফা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স মরিস ও মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজের ঋণটি দীর্ঘদিনের। পাওনা আদায়ের চেষ্টা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আইনগত প্রক্রিয়া ও সালিসি কার্যক্রম শেষে বিধিবিধান মেনেই ঋণটি অবলোপন করা হয়েছে।
ব্যাংক জানায়, গণমাধ্যমে প্রয়াত ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ছিলেন শেখ খলিফা বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের নির্দেশনা এবং দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালেই ওই ঋণের চূড়ান্ত দায় নিষ্পন্ন হয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখায় মোট ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম বা ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ অবলোপনের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে শেখ খলিফা-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ। প্রতিবেদনে আরও প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ঋণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা হলো ইউএইর চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট অবলোপিত ঋণ। আর ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ঋণকে প্রতিবেদনে আলাদাভাবে ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যাংকের ‘নিষ্পত্তি’ দাবির পাশাপাশি ইউএই কার্যক্রমে অন্যান্য ঋণ অবলোপন ও হিসাব ব্যবস্থাপনার বিষয়ও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণের পাশাপাশি ইউএই শাখাগুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট ও সান্ড্রি অ্যাসেটের মধ্যে বড় পার্থক্য এবং দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবে গরমিলের তথ্য রয়েছে।
ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি ল্যাপটপ নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জনতা ব্যাংকের দাবি, ল্যাপটপগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে এবং সেগুলো দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগের বিষয়ে ব্যাংকের বক্তব্য, ইউএইতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগে ১৯৮২ সালের স্থানীয় নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা নেই। ইতালির জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) এসআরএল বন্ধ না করার বিষয়ে ব্যাংক বলেছে, প্রবাসী আয় ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয় বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্র এখন শুধু ৩০৪ কোটি টাকার ঋণটি ‘অবলোপন’ হয়েছিল কি না, তা নয়। জনতা ব্যাংক বলছে, এটি পুরোনো ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া ঋণ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে একই ইউএই কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ বলা হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। তবে ২০০৩ সালের নিষ্পত্তির নথি, ঋণ অবলোপনের অনুমোদন ও পরবর্তী হিসাবরেকর্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এসব নথি যাচাই হলেই স্পষ্ট হবে—এটি কেবল পুরোনো একটি নিষ্পত্তি হওয়া ঋণের ঘটনা, নাকি এর সঙ্গে ইউএই কার্যক্রমের বৃহত্তর হিসাবের অসঙ্গতিরও কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন