প্রকাশিত: ৭ ঘন্টা আগে, ০৬:১০ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
কোনো বুলেট যখন বন্দুকের নল থেকে বের হয়, তখন তাতে কারও নাম লেখা থাকে না। কিন্তু সেই বুলেট যদি ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত একজন শিক্ষার্থীর বুক ভেদ করে, তখন তা কেবল একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না- লিখে যায় ইতিহাস। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক দিন, যে দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের আত্মত্যাগ একটি ছাত্র আন্দোলনকে রূপ দেয় গণঅভ্যুত্থানের পথে।
এক বছর পর, সেই দিনটির স্মরণে আজ ১৬ জুলাই পালিত হচ্ছে ‘জুলাই শহীদ দিবস’। অন্তর্বর্তী সরকার দিবসটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত দিবসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ উপলক্ষে আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। যদিও দিবসটি সরকারি ছুটির অন্তর্ভুক্ত নয়, তবুও দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করা হবে।
দিবসটির কেন্দ্রীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে- যেখান থেকে আবু সাঈদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের চার উপদেষ্টা অংশ নেবেন। পাশাপাশি দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হবে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু করলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। কিন্তু আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এরপর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বিপরীত দিক থেকে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে তার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালান। একের পর এক গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। মুহূর্তেই তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক, আর তার রক্ত নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
১৬ জুলাই শুধু আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার দিনই নয়; সেদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামেও সহিংসতায় আরও পাঁচজন নিহত হন।
ঢাকার সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা কলেজ এলাকায় সংঘর্ষে প্রাণ হারান বলাকা সিনেমা হলের সামনে ব্যবসা করা হকার মো. শাহজাহান (২৪) এবং নীলফামারীর সাবুজ আলী (২৫)।
চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম (২৪), ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ (২৪) এবং একটি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. ফারুক (৩২)।
এই ছয়টি প্রাণহানির পর কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এবং পরবর্তীতে এক দফার গণআন্দোলনে।
সেদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েন্সল্যাব, প্রগতি সরণি, শান্তিনগর, বাড্ডা, মতিঝিল, তাঁতীবাজার, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। মহাখালীতে রেললাইন অবরোধের কারণে প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ ছিল ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল।
একই সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও অবরোধ গড়ে তোলা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে সায়েন্সল্যাব, ঢাকা কলেজ, ভাটারা, মিরপুর-১০, ফার্মগেট, চানখাঁরপুল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পরিস্থিতির অবনতি হলে ১৬ জুলাই রাতেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। স্থগিত করা হয় ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও।
পরদিন আওয়ামী লীগ আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার ঘোষণা দেয় এবং নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশনা দেয়।
অন্যদিকে বিএনপি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনগণকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও রাজপথে থাকার ঘোষণা দেয়। একই সময়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন।
ঘটনার পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার এবং সুজনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন পৃথক বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানায়।
এছাড়া দেশের অন্তত ১১৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক, ১৯৯০ সালের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারাও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৭ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে 'রাজনীতিমুক্ত' ঘোষণা করেন।
১৮ জুলাই দেশজুড়ে শুরু হয় সর্বাত্মক প্রতিরোধ। সহিংসতা, গুলি, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির মধ্যেই সরকার ইন্টারনেট বন্ধ এবং পরে কারফিউ জারি করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পর দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষও যুক্ত হন এই আন্দোলনে।
ছাত্রদের দাবি পরিণত হয় গণমানুষের দাবিতে। সেই ধারাবাহিকতায় আগস্টে গড়ে ওঠে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন।
আজ ১৬ জুলাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি সাহস, আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং গণআন্দোলনের প্রতীক। আবু সাঈদসহ সেদিন শহীদ হওয়া ছয়জনের রক্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই একটি আন্দোলন পরিণত হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে- যার প্রভাব এখনো দেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন