প্রকাশিত: ৭ ঘন্টা আগে, ০৬:৪৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বর্ষণ ও চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যার প্রভাবে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস, পাইকারি বাজারে বেচাকেনা এবং সারা দেশে পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন সবজি।
এরই মধ্যে গত দুই দিনে চট্টগ্রামে সবজির দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, গ্রীষ্মকালীন সবজি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে সবজির বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম সবজি উৎপাদন এলাকা শঙ্খ নদীর চরাঞ্চল। দোহাজারী উপজেলার শঙ্খ নদীর চরে আকস্মিক বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে। পানি নেমে গেলেও নদীর স্রোতে ভেসে আসা মোটা বালুর স্তরে উর্বর জমি চাপা পড়েছে। ফলে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে কৃষকদের বড় সংকটে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ও ছদাহা এলাকায় ব্যাপকভাবে সবজি উৎপাদন হয়। এর বাইরে বাঁশখালীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদিত হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শঙ্খ নদীর চরাঞ্চল থেকে সারা বছর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ শাকসবজি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এবারের বন্যায় অধিকাংশ কৃষকের ক্ষেতের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, বন্যায় ৯০০ হেক্টর সবজি, ৭০ হেক্টর পেঁপে এবং অন্যান্য ফসলের প্রায় ৬০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের এ বন্যার নেতিবাচক প্রভাব সবজির বাজারে পড়বে।
এদিকে কৃষি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন করা না গেলে আগামী মৌসুমেও সবজির উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, আমি ২৫ গন্ডা জমিতে তিত করলার চাষ করেছিলাম। বন্যায় সবকিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। এবার ফলন খুব ভালো হয়েছিল এবং করলা তোলার উপযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাজারজাত করার আগেই বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে যায়। এ ফসল বিক্রি করে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করতে পারতাম।
গত বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। এ সময় তারা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করেন।
পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তারা জানান, বালুচাপায় ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরায় চাষের উপযোগী করার উপায় নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও আর্থিক প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সরকার কৃষকদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তারা।
অন্যদিকে, শুক্রবার (১৭ জুলাই) চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম আগের তুলনায় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে আলু প্রতি কেজি ২৫ টাকা (চার কেজি ১০০ টাকা) দরে বিক্রি হলেও অন্যান্য সবজির দাম তুলনামূলক বেশি।
বর্তমানে মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৫০ টাকা, পেঁপে ৫০ টাকা, কাঁকরোল ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, দেশি গাজর ৮০ টাকা এবং আমদানি করা গাজর ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কচুর লতি ৮০ টাকা এবং কচুরমুখী ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া বরবটি, ঝিঙা, পটল ও করলা প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, শিম ১৫০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, ধনেপাতা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং শাক প্রতি আঁটি ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সবজির উৎপাদন নিয়ে সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের পুনরুদ্ধারে সরকার জরুরি সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩২৭ মেট্রিক টন ধানবীজসহ অন্যান্য সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এসব সহায়তা কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আবার সবজি উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি প্রণোদনা জরুরি। কারণ অধিকাংশ কৃষক ঋণ নিয়ে ফসল উৎপাদন করেন। এবার সেই ফসল বন্যায় তলিয়ে গেছে। ফলে নতুন করে ঋণ নিয়ে সবজি চাষ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দিন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, বন্যার কারণে উৎপাদন এলাকা থেকে নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে সবজির দাম আরও বাড়তে পারে।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আজাদ হোসেন বলেন, এবারের বন্যায় চন্দনাইশের শঙ্খ নদীর চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জমি বালুচাপায় পড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আগামী কয়েক সপ্তাহ স্থানীয় সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত বীজ, চারা, সার ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া গেলে তারা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবেন এবং বাজারও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন