প্রকাশিত: ১৫ ঘন্টা আগে, ১১:১৮ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ভাতা তুলতে গিয়ে হারালেন দুই আঙুল, ৮৮ বছরেও থামেনি লোকনাথের জীবনসংগ্রাম

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন বিশ্রামে থাকার কথা, তখনও সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে বসে সূক্ষ্ম কারিগরি কাজ করেন ৮৮ বছর বয়সী লোকনাথ ধর। সেই হাতই ছিল তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে নরসিংদী পৌরসভায় দুর্ঘটনায় বাম হাতের দুটি আঙুল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবিকা ও ছোট মেয়ের বিয়ে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।

লোকনাথ ধর নরসিংদী শহরের বানিয়াছল এলাকার বাসিন্দা। পাঁচ মেয়ের জনক তিনি। ছেলে না থাকায় দীর্ঘদিন স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে কাজ করে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে বড় মেয়ের বাড়িতে থেকে প্রতিদিন নরসিংদী বাজারের একটি স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে কাজ করেন। বয়সের ভার, ঝাপসা দৃষ্টি কিংবা শারীরিক ক্লান্তি কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। কারণ এখনও ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি, পাশাপাশি সংসারের খরচও চালাতে হয়।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের বয়স্ক ভাতার ৩ হাজার ৯০০ টাকা তার কাছে ছিল কয়েক মাসের ওষুধ, সংসারের বাজার এবং ছোট মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়ের আশার প্রতীক। গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সেই ভাতার টাকা তুলতে নরসিংদী পৌরসভায় যান তিনি। কিন্তু টাকা নিয়ে নয়, জীবনের বড় এক ক্ষতি নিয়েই ফিরতে হয় তাকে।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পৌরসভার ভাতা বিতরণ কক্ষের দরজার পাশে আশ্রয় নেন লোকনাথ ধর। এ সময় বাইরে থাকা মানুষকে আটকে রাখতে ভেতর থেকে দরজাটি জোরে বন্ধ করে দেওয়া হলে দরজার ফাঁকে চাপা পড়ে তার বাম হাতের দুটি আঙুল। মুহূর্তেই তার আর্তচিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসে। পরে দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান।

সেখানে চিকিৎসকেরা প্রথমে আঙুল দুটি কেটে ফেলার পরামর্শ দিলেও স্বজনদের অনুরোধে অস্ত্রোপচার করে রড বসিয়ে আঙুল দুটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেন। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য, আঙুল দুটি সচল রাখার সম্ভাবনা খুবই কম।

সোমবার (১৩ জুলাই) সরেজমিনে বানিয়াছল এলাকায় লোকনাথ ধরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আহত হাত নিয়ে বিছানায় শুয়ে কষ্টে দিন কাটছে তার। ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। মাঝেমধ্যে আহত হাতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। যে হাত দিয়ে সারাজীবন অন্যের জন্য গয়না তৈরি করেছেন, সেই হাত দিয়েই হয়তো আর কোনোদিন আগের মতো কাজ করতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা কাজ করতে না পারলে কীভাবে চলবে সংসার, আর কীভাবে হবে ছোট মেয়ের বিয়ে।

লোকনাথ ধরের স্ত্রী গীতা রাণী বণিক বলেন, ভাতার টাকা আনতে গিয়ে উনি দুই আঙুল হারিয়ে ফেলেছেন। পৌরসভার একজন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে রেখে চলে আসেন। পরে নিজ উদ্যোগেই চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এখন সারাদিন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। সংসার কীভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।


নাতি সজল বণিক বলেন, ডাক্তার আঙুল দুটি কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন। আমরা অনুরোধ করায় অপারেশন করে রড বসানো হয়েছে। তবে চিকিৎসক জানিয়েছেন, এগুলো সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমাদের পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। পৌরসভা ও সমাজসেবা অফিস থেকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছি। সরকারের আরও সহযোগিতা পেলে দাদুর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবো।

লোকনাথ ধর বলেন, বয়স্ক ভাতা আনতে গিয়ে আমার দুটি আঙুল নষ্ট হয়ে গেছে। এই হাত দিয়েই স্বর্ণকারের কাজ করে সংসার চালাতাম। এখনও এক মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি। এখন কীভাবে সংসার চালাব, কীভাবে মেয়ের বিয়ে দেব এসব চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই, যাতে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।

নরসিংদী শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে আমরা তার বাড়িতে গিয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি। পাশাপাশি সরকারি অনুদানের জন্য লিখিত আবেদন করতে বলা হয়েছে। আবেদন পেলে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া তাকে বয়স্ক ভাতা থেকে প্রতিবন্ধী ভাতায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে নরসিংদী পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোছা. নাদিরা আখতার বলেন, অনেক মানুষের চাপাচাপির মধ্যে অসাবধানতাবশত তার আঙুল দরজায় চাপা পড়ে। মানবিক দিক বিবেচনায় পৌরসভার পক্ষ থেকে তাকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে বয়স্ক ভাতা বিতরণের দায়িত্ব পৌরসভার নয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌরসভা প্রাঙ্গণে ভাতা বিতরণ করা হচ্ছে, কারণ এখানে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।

বাংরা ধারা ডেক্স

মন্তব্য করুন