আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: ১৭ ঘন্টা আগে, ০৯:৩৪ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছরেও

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের ২০ শতাংশ এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

ফাইল ছবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় সংঘটিত হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় হারিয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদের কোনো হদিস মেলেনি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় এগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও অন্যান্য পুলিশ স্থাপনায় হামলার সময় মোট ১১ ধরনের ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার হলেও বাকি ২০ শতাংশ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১১২টি চায়না রাইফেল, ৩৮৪টি শটগান, ৪৪৫টি ৯ মিলিমিটার পিস্তল, ২০৫টি ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার পিস্তল, ১২৮টি ৩৮ মিলিমিটার গ্যাসগান, ৩১টি টি-৫৬ এসএমজি, সাতটি টিয়ার গ্যাস লঞ্চার, তিনটি এলএমজি, দুটি ২৬ মিলিমিটার পিস্তল এবং একটি টি-০৮ রাইফেল। পাশাপাশি এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯ রাউন্ড গোলাবারুদ।

পুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশই বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে এসব অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রমাণ মিলেছে। এতে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে যে, নিখোঁজ অস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে পুলিশের লুট হওয়া একটি পিস্তল ও আট রাউন্ড গুলিসহ রনি নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। এর আগে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকায় দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের গোলাগুলির ঘটনার পর থানা থেকে লুট হওয়া গুলি ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। একই বছরের আগস্টে চট্টগ্রামের কুয়াইশ এলাকায় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় পুলিশের লুট হওয়া শটগানের কার্তুজ। সাতকানিয়ায় পিটুনিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধার হওয়া একটি পিস্তলও কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র বলে নিশ্চিত করে পুলিশ। এছাড়া খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে পুলিশের আরও বেশ কয়েকটি লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনাই প্রমাণ করছে, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ ইতোমধ্যে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা মনে করেন, থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র কোনো সাধারণ মানুষের হাতে যায়নি। তাঁর ভাষায়, এসব অস্ত্র অপরাধীরাই নিয়েছে এবং সুযোগ পেলেই সেগুলো ব্যবহার করবে। বিশেষ করে শতাধিক চায়না রাইফেল এখনো উদ্ধার না হওয়াকে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র যদি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে থেকে থাকে, তাহলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী লুট হওয়া কিছু অস্ত্র ইতোমধ্যে সন্ত্রাসীরা বিক্রি করেছে। কিছু অস্ত্র ভাড়ায় ব্যবহার করার তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে দেশের বাইরে পাচার হয়ে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এসব তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালিত হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য এখনো আসেনি। বর্তমানে অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ চলমান রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা, বিশেষ অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিখোঁজ অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এস এম শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসীরা বেচাকেনা করেছে এবং কিছু অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যাদের কাছেই এসব অস্ত্র থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রায় দুই বছর পরও রাষ্ট্রীয় অস্ত্রভাণ্ডারের এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিখোঁজ থাকায় বিষয়টি এখন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, বরং গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান জোরদার, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অন্যথায় নিখোঁজ এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপরাধ কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন