প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ০১:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত না হলে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি, চিকিৎসায় নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
অন্যের জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মানবিক উদ্যোগই তার জীবনে নিয়ে আসে এক কঠিন বাস্তবতা। বিদেশে যাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এরপর থেকে শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যয়বহুল ওষুধ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই।
ময়মনসিংহের এক বাসিন্দার এই অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসকে সামনে রেখে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিরাপদ রক্ত সংগ্রহে অনিয়ম, অনুমোদনহীন ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম, পর্যাপ্ত স্ক্রিনিংয়ের অভাব এবং রোগীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে তথ্য সংকট, সব মিলিয়ে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ।
স্ক্রিনিং ছাড়াই রক্ত সংগ্রহের অভিযোগ
ভুক্তভোগীর দাবি, প্রথমবার রক্ত দেওয়ার সময় শুধু রক্তের গ্রুপ জেনেই তার কাছ থেকে রক্ত নেওয়া হয়েছিল। কোনো ধরনের সংক্রমণ পরীক্ষা করা হয়নি। পরে বিদেশে যাওয়ার মেডিকেল পরীক্ষায় ধরা পড়ে হেপাটাইটিস বি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন রক্তদাতা। তাদের অভিযোগ, অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালেও প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ছাড়াই রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন সেন্টারের পরিচালক মমিনুর রহমান প্লাবন বলেন, শুধু রক্তের গ্রুপ মিললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রক্ত সংগ্রহের আগে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি, সিফিলিসসহ রক্তবাহিত সংক্রমণের বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এই ন্যূনতম মানও মানা হচ্ছে না।
রক্তদাতা ও গ্রহীতা, উভয়েই ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত না হলে শুধু রক্তগ্রহীতা নয়, রক্তদাতারও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। হেপাটাইটিস বি মূলত সংক্রমিত রক্ত, শরীরের তরল, অনিরাপদ সূঁচ এবং মা থেকে নবজাতকের মধ্যে ছড়ায়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি প্রধানত রক্তের মাধ্যমেই সংক্রমিত হয়।
তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি কীভাবে আক্রান্ত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা-নথি ও মহামারিবিদ্যাগত তদন্ত প্রয়োজন। শুধু রক্তদান বা রক্তগ্রহণের ভিত্তিতে সংক্রমণের উৎস নির্ধারণ করা যায় না।
রক্তের কালোবাজারির অভিযোগও রয়েছে
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু এলাকায় রক্তের অবৈধ বাণিজ্যও চলছে। অভিযোগ রয়েছে, রোগীর প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে অব্যবহৃত রক্ত অর্থের বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সেই রক্ত সরবরাহ করা হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, মানবিক বিষয়কে পুঁজি করে একটি অসাধু চক্র রক্তের কালোবাজারি করছে। এর সঙ্গে কিছু রক্তদাতা, হাসপাতালের কর্মচারী, দালাল ও অনুমোদনহীন রক্ত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আক্রান্ত কতজন, জানে না স্বাস্থ্য বিভাগ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- ময়মনসিংহে হেপাটাইটিস বি ও সি-তে কতজন আক্রান্ত কিংবা কতজন মারা গেছেন, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ জানিয়েছেন, জেলা পর্যায়ে এ রোগের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে রোগের প্রকৃত বিস্তার, চিকিৎসা গ্রহণকারীর সংখ্যা কিংবা জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর হিসাবও অজানা থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের নীরব শত্রু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি এবং প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস সি নিয়ে বসবাস করছেন।
শুধু ২০২৪ সালেই হেপাটাইটিস বি-তে প্রায় ১১ লাখ এবং হেপাটাইটিস সি-তে প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার মৃত্যুর কারণ।
বাংলাদেশে ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি-এর সংক্রমণের হার প্রায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ, আর হেপাটাইটিস সি-এর হার ১ থেকে ৩ শতাংশ।
অনেকেই জানেন না, শরীরে ভাইরাস বহন করছেন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অরুণ জ্যোতি তারাফদার বলেন, অনেক মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলেও দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ না থাকায় বিষয়টি জানতেই পারেন না।
তার মতে, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হলে এটি ধীরে ধীরে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার এমনকি লিভার বিকল হওয়ার মতো জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
চিকিৎসার ব্যয়ও বড় বোঝা
রোগ শনাক্ত হওয়ার পরই শুরু হয় ব্যয়বহুল চিকিৎসা। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডিএনএ টেস্ট, নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসকের ফি এবং হাসপাতালে যাতায়াত, সব মিলিয়ে একজন রোগীর পেছনে মাসে হাজার হাজার টাকা ব্যয় হয়।
শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীর সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্যকে প্রায় প্রতিবার হাসপাতালে যেতে হওয়ায় কর্মঘণ্টা নষ্ট ও অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপও তৈরি হয়।
হেপাটাইটিস সি নিরাময়যোগ্য, বি প্রতিরোধযোগ্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আধুনিক ডাইরেক্ট অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল (ডিএএ) ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি-এর ৯৫ শতাংশের বেশি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন।
অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি-এর কার্যকর টিকা রয়েছে। সময়মতো টিকাদান, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং নিয়মিত পরীক্ষা রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—
শতভাগ নিরাপদ ও স্ক্রিনিং করা রক্ত নিশ্চিত করা
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে ব্যাপক পরীক্ষা কার্যক্রম চালানো
আক্রান্তদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা
তাদের মতে, হেপাটাইটিস নীরবে শরীরে বাসা বাঁধলেও এর প্রভাব শুধু রোগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয় চিকিৎসা, অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার ভার।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন