প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৫:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইয়ারবাড এখন দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। যাতায়াতের পথে গান শোনা, ব্যায়ামের সময় পডকাস্ট বা ভিডিও দেখা, ফোনে কথা বলা কিংবা কাজের ফাঁকে বিনোদন, সব ক্ষেত্রেই অনেকেই দীর্ঘ সময় কানে ইয়ারবাড লাগিয়ে রাখেন। কিন্তু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়ারবাড ব্যবহারের এই অভ্যাস অজান্তেই শ্রবণশক্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ইয়ারবাড ব্যবহার করলেই কানের ক্ষতি হয়, বিষয়টি এমন নয়। মূল ঝুঁকি তৈরি হয় কতটা জোরে, কতক্ষণ এবং কত ঘন ঘন শব্দ শোনা হচ্ছে, তার ওপর। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে ইয়ারবাড ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
কীভাবে ক্ষতি করে ইয়ারবাড?
ইয়ারবাড কানের পর্দার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে উচ্চমাত্রার শব্দ সরাসরি কানের ভেতরে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শে থাকলে অন্তঃকর্ণের ক্ষুদ্র হেয়ার সেল বা শ্রবণগ্রাহী কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শব্দ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এসব কোষ একবার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাভাবিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হয় না।
ঝুঁকি আরও বাড়ে যখন কেউ কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে ইয়ারবাড ব্যবহার করেন। বাইরের শব্দ ঢেকে দিতে তখন অনেকেই অজান্তে ভলিউম বাড়িয়ে দেন। কানে ঠিকমতো না বসা ইয়ারবাডের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শব্দ কানের ভেতরে পৌঁছায়।
শুধু শ্রবণশক্তিই নয়, দীর্ঘ সময় ইয়ারবাড ব্যবহারে কানে অতিরিক্ত খৈল জমে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। এর ফলে কান বন্ধ বা ভারী লাগা, অস্বস্তি কিংবা সাময়িকভাবে কম শোনার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় কী বলছে?
২০২২ সালে ‘কিউরিয়াস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি সাহিত্য পর্যালোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৩টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ব্যক্তিগত মিউজিক প্লেয়ার, ইয়ারফোন ও হেডফোন ব্যবহারের সঙ্গে শব্দজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের সম্ভাব্য সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণাগুলোতে ব্যক্তিগত মিউজিক প্লেয়ারের শব্দের মাত্রা ৭৮ থেকে ১৩৬ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দীর্ঘ সময়ের জন্য শ্রবণশক্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রবণশক্তি হ্রাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্য একটি গবেষণায় কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত কিশোর-কিশোরীদের শ্রবণ সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার নিরাপদ?
ইয়ারবাড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ ঝুঁকি নির্ভর করে শব্দের মাত্রা, ব্যবহারের সময় এবং ব্যবহারের ঘনত্বের ওপর। তবে শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রচলিত একটি সাধারণ পরামর্শ হলো ‘৬০/৬০ নিয়ম’, অর্থাৎ ডিভাইসের সর্বোচ্চ ভলিউমের প্রায় ৬০ শতাংশের মধ্যে শব্দের মাত্রা রাখা এবং একটানা প্রায় ৬০ মিনিটের বেশি না শোনা।
একটানা সারাদিন ইয়ারবাড কানে লাগিয়ে রাখার পরিবর্তে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চ শব্দে দীর্ঘ সময় শোনার পর কানকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া উচিত। কোলাহলপূর্ণ জায়গায় ভলিউম বাড়ানোর বদলে ভালোভাবে কানে বসে এমন ইয়ারবাড বা নয়েজ-ক্যানসেলিং সুবিধা ব্যবহার করাও শব্দের মাত্রা কম রাখতে সহায়তা করতে পারে।
২০২৫ সালে ‘জার্নাল অব অডিওলজি অ্যান্ড অটোলজি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দীর্ঘ সময় ইয়ারফোন ব্যবহারের সঙ্গে কানের সংক্রমণের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় একটানা এক ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ইয়ারফোন-সম্পর্কিত কানের সংক্রমণের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
কানের সুরক্ষায় যা মনে রাখা জরুরি
ইয়ারবাড পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ব্যবহারের ধরনেই সতর্কতা আনা জরুরি। ভলিউম যতটা সম্ভব কম রাখা, একটানা দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে ভলিউম বাড়িয়ে না শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
কানে দীর্ঘস্থায়ী ভোঁ ভোঁ শব্দ, কান বন্ধ লাগা, অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা বা আগের তুলনায় কম শোনার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসক বা শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ ইয়ারবাড নিজে যতটা না সমস্যা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে এবং কতক্ষণ তা ব্যবহার করা হচ্ছে। একটু সচেতন হলেই দৈনন্দিন বিনোদনের এই মাধ্যমটি ব্যবহার করেও কানের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন