প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৯:৪০ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার দুই দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এরই মধ্যে বন্যার ধ্বংসাবশেষে তৈরি অস্থায়ী একটি হ্রদে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি সম্ভাব্য আরেকটি বিপর্যয় ঠেকানোই এখন নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত নেপালে বন্যায় অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বত অঞ্চলে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।
বুধবার সকালে হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীগুলোর দিকে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্ট প্রবল স্রোত নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও উপত্যকা প্লাবিত করে। একই দুর্যোগের প্রভাব পড়ে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও।
প্রবল স্রোতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় এই পথের বিভিন্ন অংশ এখন কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা।
দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে নেপাল কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজারো মানুষের কাছে খাবার, পানি ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন উদ্ধারকারীরা। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্যেও নিখোঁজদের সন্ধান চলছে। এরই মধ্যে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার ভয়াবহতা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের কথায় উঠে আসছে স্বজন হারানোর নির্মম বাস্তবতা। বৃহস্পতিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি নেপালের রাসুয়া শহর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন দিবগা তামাং। আরও তিনজনের সঙ্গে তাকে হেলিকপ্টারে করে নুয়াকোটের একটি সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়।
উদ্ধারের পর স্বজনদের কথা বলতে গিয়ে তামাং জানান, তার পরিচিত ও আপনজনদের কেউ আর বেঁচে নেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সবাই চলে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। সবকিছু এবং সবাই চলে গেছে।’
তামাংয়ের এই বক্তব্য শুধু একটি পরিবারের নয়, ভয়াবহ বন্যায় স্বজন ও ঘরবাড়ি হারানো অসংখ্য মানুষের অসহায় অবস্থারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বন্যার ধ্বংসাবশেষে সৃষ্টি হওয়া একটি অস্থায়ী হ্রদকে ঘিরে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ জমে ভোতেকোশি নদীর ওপর হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে পানির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
এই অস্থায়ী হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে ভোতেকোশি নদীতে ফের প্রবল স্রোত তৈরি হয়ে আশপাশের এলাকায় নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
চীনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চীনা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি বাঁধ দিয়ে আটকে থাকা ওই হ্রদে প্রবেশ করতে পারে। এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জলবিদ্যা বিভাগের গবেষক ঝু জিনফেং বলেন, হ্রদে পানির পরিমাণ যত বাড়ছে, ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
বন্যার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি গিরং কাউন্টির সীমান্তবর্তী গিরং সীমান্ত বন্দর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কে গিরং সীমান্ত বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন লজিস্টিক ও পার্কিং অবকাঠামো।
বুধবার ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কাদামিশ্রিত পানি ও ধ্বংসাবশেষ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ সময় পালানোর চেষ্টা করা কয়েকজন মানুষকেও পানির প্রবল স্রোতের মধ্যে পড়ে যেতে দেখা যায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুই দেশের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় একদিকে চলছে নিখোঁজদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারের কাজ, অন্যদিকে বাড়ছে নতুন বন্যার আশঙ্কা। ফলে দুর্যোগের প্রথম ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বিপর্যয় ঠেকাতে এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নেপাল ও চীনের প্রশাসন। সময়ের সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের আশা কমে এলেও নিখোঁজদের সন্ধান এবং নতুন বিপর্যয় মোকাবিলায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন