প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৯:৫৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় এবার সক্রিয় হলো কাতার। এতদিন পাকিস্তান অনেকটা এককভাবে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার উদ্যোগ চালিয়ে এলেও এবার সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাতারও। এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি।
কাতারের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনায় আগ্রহ হারানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ওয়াশিংটন এখন আর তেহরানের সঙ্গে বৈঠক বা আলোচনা চালিয়ে যেতে চায় না। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যদি ফলপ্রসূ আলোচনায় ফিরতে চায়, তাহলে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরুর ঘোষণা দেন। এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে দেশটির অর্থনীতির ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের (ইরান) সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না। ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে বৈঠক কিংবা এ ধরনের কোনো কিছুর পরিকল্পনাও আমাদের নেই।’ তবে একই বক্তব্যে তিনি আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা চাই, ইরান একটি ফলপ্রসূ আলোচনার সিদ্ধান্ত নিক। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই অর্থনৈতিক অভিযান চলবে।’
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর প্রায় ছয় মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দফা যুদ্ধবিরতিও হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে দুই দেশ।
এ অবস্থায় সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপের কৌশল গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না এসে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি বৃহস্পতিবার তেহরানে পৌঁছান। ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার মাত্র চার দিন পর তার এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।
তেহরানে তিনি ইরানের শীর্ষ আলোচক ও ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আল-থানি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফের কূটনৈতিক আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
তবে ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনায় ফেরার জন্য একটি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। ঘালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তেহরান আবার কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরতে পারে।
অর্থাৎ আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডের ওপর হামলা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমি ব্যবহার বন্ধ না হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করা কঠিন হবে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘালিবাফের বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নির্বাহী প্রধান মেজর জেনারেল মোহসিন রেজায়িও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি হরমুজ প্রণালী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন।
রেজায়ি বলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই আলোচনায় আগ্রহী হয়, তাহলে ইরানের হরমুজ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই সেই আলোচনা শুরু করতে হবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের যেকোনো সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ করলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রেজায়ি। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে কঠোর হামলা চালানো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ, ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাতারের এই তৎপরতা নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে কাতারের সরাসরি সম্পৃক্ততা মধ্যস্থতার পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানকে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে আলোচনায় আনতে, আর ইরান আলোচনায় ফেরার আগে মার্কিন সামরিক তৎপরতা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহারের বিষয়টি বন্ধের শর্ত দিচ্ছে।
এই অবস্থায় কাতারের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন