প্রকাশিত: ৫৭ মিনিট আগে, ০৪:৩১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে একই ধরনের নৈরাজ্য, তর্ক-বিতর্ক ও বাজার ধসের খবর দেখা যায়। মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ— ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দেন, যার ফলে তারা মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হন।
বিপরীতে ট্যানারি মালিকদের পাল্টা যুক্তি— আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়ার চাহিদা কম, সিইটিপির ব্যর্থতায় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ (এলডব্লিউজি) না থাকায় তারা বড় বায়ার পাচ্ছেন না, তদুপরি রাসায়নিক ও উৎপাদনের ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে কাঁচা চামড়া কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
আবার মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদারদের দিকে আঙুল উঠলে তারা বর্জ্য ও সংরক্ষণের খরচের হিসাব সামনে আনেন। তাদের দাবি, পশু জবাইয়ের পর চামড়া সংগ্রহ, তাতে লবণের প্রয়োগ, পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, গুদাম ভাড়া এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হিসাব করলে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যকার পুরো ব্যবধানকে কোনোভাবেই একক ‘মুনাফা’ বলা চলে না।
তাহলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের আসল জট কোথায়? ঢাকা পোস্টের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে নকশাগত ত্রুটি, সিইটিপির ব্যর্থতা ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাবে সাভার চামড়া শিল্পনগরী বিশ্বের মূলধারার বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিলিয়ন ডলারের খাঁচায় বন্দি হয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনের শেষ পর্বে উঠে এসেছে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের গলদ, ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের খেলাপি চক্র, ‘কার্যকর ক্রেতা’র আকাল এবং কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সরকারের নেওয়া নতুন মাস্টার প্ল্যানের চুলচেরা বিশ্লেষণ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কাঁচা চামড়ার বাজারের মূল সংকটটি চিহ্নিত করে বলেন, “বাংলাদেশে চামড়া উৎপাদনের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক ‘কার্যকর ক্রেতা’র সংখ্যা অত্যন্ত কম। এটিই চামড়ার দরপতনের মূল কারণ।”
বিসিকের তথ্য এবং খাতসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের কোরবানির মৌসুমে দেশে আনুমানিক ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি পশু কোরবানি হয়, যার মধ্যে কেবল কোরবানির ঈদেই প্রায় ৫৬ লাখ ৭০ হাজার পিস গরুর চামড়া এবং বিপুল পরিমাণ ছাগল ও ভেড়ার চামড়া বাজারে আসে। তবে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত চামড়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়ে মূল সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে ছিটকে পড়ে। হাজারীবাগে একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩০০ ট্যানারি সক্রিয় থাকলেও সাভারে স্থানান্তরের পর বিসিকের ২০৫টি প্লটের মধ্যে ১৬২টি ট্যানারির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং মাত্র ১৫৫ থেকে ১৫৬টি কারখানার প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে। অর্থাৎ স্থানান্তরের পর কার্যকর ট্যানারির সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
সাভারে স্থানান্তরিত অনেক ট্যানারি বর্তমানে কাগজে-কলমে টিকে থাকলেও বাস্তবে উৎপাদনে নেই। তদুপরি অনেক ট্যানারি মালিক ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা ঋণখেলাপি হওয়ায় নতুন করে কার্যকর মূলধন পাচ্ছেন না। ফলে কোরবানির ঈদের মাত্র দুই-তিন দিনে যখন বিশাল পরিমাণ চামড়া বাজারে এসে পৌঁছায়, তখন তা কেনার মতো নগদ অর্থ বা সক্ষম ক্রেতা বাজারে থাকে না। সরবরাহ বিপুল কিন্তু ক্রেতার হাতে টাকা না থাকায় স্বাভাবিক নিয়মেই কাঁচা চামড়ার দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকে। কাঁচা চামড়ার সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় মারাত্মক প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক গলদ রয়েছে। চামড়া ব্যবসায়ী রুবেলের মতো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের তীব্র অভিযোগ— তারা চামড়া কিনে আড়তে নিয়ে গেলে আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দর ফেলে দেন এবং পরবর্তীতে সেই চামড়া ট্যানারিতে চড়া দামে বিক্রি করেন। তবে, বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. টিপু সুলতান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘একটি কাঁচা চামড়া পশুর শরীর থেকে ছাড়ানোর পর তাতে সময়মতো মানসম্মত লবণ প্রয়োগ করতে হয়। এরপর পরিবহন খরচ, দিনমজুরের মজুরি, গুদাম ভাড়া, লবণের চড়া দাম এবং ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে আড়তদারদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাই কেনা ও বিক্রির মধ্যকার সম্পূর্ণ গ্যাপটিকে আড়তদারের পকেটের মুনাফা মনে করা ভুল।’
টিপু সুলতান উল্টো অভিযোগ করে বলেন, ‘মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না বুঝে কম দামে চামড়া কিনে বেশি লাভের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ফেলে রাখেন। সঠিক সময়ে ও সঠিক পরিমাণে লবণ ব্যবহার না করায় ট্যানারিতে পৌঁছানোর আগেই চামড়ায় ব্যাকটেরিয়া ধরে যায় এবং চামড়া পচে গুণগত মান হারিয়ে ফেলে।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াৎ উল্লাহও প্রায় একই মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘সারা বছর যখন স্বাভাবিক সরবরাহ থাকে, তখন চামড়ার দাম নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হয় না। সমস্যা হয় কোরবানির ঈদের এই দুই-তিন দিনে, যখন হঠাৎ করে কোটি চামড়া একসঙ্গে সরবরাহ হয় কিন্তু সংরক্ষণের আধুনিক অবকাঠামো থাকে না।’
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন