প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৮:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় উচ্চ ফলনশীল জি-৯ (গ্র্যান্ড নাইন) জাতের কলার বাণিজ্যিক চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষক ও উদ্যোক্তা শাহ আলম জমাদ্দার।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং সমন্বিত বাগান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি লাভজনক কৃষির একটি সফল মডেল গড়ে তুলেছেন। কম খরচ ও স্বল্প সময়ে জি-৯ (গ্র্যান্ড নাইন) জাতের কলা চাষের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের ফসলের চাষ ও ভালো ফলন পাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে কলা চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী ইউনিয়নের দক্ষিণ রণগোপালদী গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম জমাদ্দার দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রচলিত ফল চাষের পাশাপাশি নতুন ও লাভজনক জাতের ফসল নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই তিনি উচ্চ ফলনশীল জি-৯ কলা চাষের উদ্যোগ নেন। অনলাইনে বিভিন্ন কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখে এ জাতের কলা সম্পর্কে ধারণা লাভের পর তিনি রংপুরের একটি নার্সারি থেকে প্রথম দফায় ১০০টি টিস্যু কালচার চারা সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তার বাগানে দেড় শতাধিক জি-৯ কলার গাছ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসএসিপি-রেইনস প্রকল্পের আওতায় শাহ আলম জমাদ্দারকে নগদ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ৩০টি জি-৯ কলার চারা এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত তার বাগান পরিদর্শন করে আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি, রোগবালাই দমন এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
শাহ আলম জমাদ্দার বাসস’কে বলেন, এর আগে তিনি বরইসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করে সফলতা অর্জন করেছিলেন। পরে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ এবং এসএসিপি-রেইনস প্রকল্পের সহায়তায় জি-৯ কলা চাষে উদ্বুদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি প্রায় ২ একর জমিতে ১২ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে কলার চারা রোপণ করেছেন। একই সঙ্গে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে কলাগাছের মাঝখানে আমের চারা রোপণ করেছেন, যা সমন্বিত বাগান ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জি-৯ জাতের কলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ ফলন এবং বাজারে ভালো দাম। সাধারণ জাতের তুলনায় এ কলার আকার বড় এবং প্রতিটি কাঁদিতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত কলা ধরে। বর্তমানে তার বাগানের ১৫ থেকে ১৬টি গাছে ফল এসেছে। পাশাপাশি নিজস্ব নার্সারিতে উৎপাদিত প্রতিটি টিস্যু কালচার চারা ন্যূনতম ১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, যা তার জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করেছে।
শাহ আলম আরও জানান, বাগান স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ে তার প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে সঠিক পরিচর্যা এবং বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ চাষ থেকে উল্লেখযোগ্য লাভ করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী। তার মতে, অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় জি-৯ কলা চাষে শ্রমের প্রয়োজন কম। গাছ বড় হওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশের ঠেকনা দিলেই তা নিরাপদ থাকে। এছাড়া তিনি নিয়মিত অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী মোচা কাটার পর ফলকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষায় সীমিত পরিসরে কীটনাশক প্রয়োগ করেন।
তিনি বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদের পরামর্শে তিনি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ফলের চারা এবং লাভজনক বাগান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। কৃষি বিভাগের নিয়মিত সহযোগিতা ও পরামর্শই তাকে নতুন উদ্যোগ গ্রহণে সাহস জুগিয়েছে।
শাহ আলম জমাদ্দারের নার্সারিতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী অনুপ কুমার শানু বলেন, জি-৯ কলার এমন পরিকল্পিত ও পরিচ্ছন্ন বাগান এ এলাকায় খুব একটা দেখা যায় না। বাগানটি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল কলা চাষ অন্য কৃষকদেরও নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করবে। কৃষি বিভাগের সহায়তায় এমন উদ্যোগ বাড়লে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন এবং এলাকার কৃষিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
নার্সারিতে ঘুরতে আসা দশমিনা উপজেলার সাংবাদিক সঞ্জয় ব্যানার্জি বলেন, জি-৯ কলার বাগান দশমিনায় সম্ভবত এটাই প্রথম। আশা করি এই বাগানের কলা দশমিনাসহ পাশ্ববর্তী উপজেলাসমূহ তথা দক্ষিণাঞ্চলে কলার চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। শাহ আলম জমাদ্দারের জন্য শুভ কামনা রইলো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ বাসস’কে বলেন, জি-৯ একটি উচ্চ ফলনশীল, রোগসহনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কলার জাত। ফলন বেশি হওয়ায় কৃষক সহজেই ভালো আয় করতে পারেন। কৃষি বিভাগ শাহ আলম জমাদ্দারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়নে শাহ আলমের মতো নতুন কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন