প্রকাশিত: ৫৫ মিনিট আগে, ১১:৩৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের অর্থনীতির আকার গত ১৫ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হলেও পুঁজিবাজারের অবস্থান তার উল্টো। ২০১০ সালের ধসের পর থেকে বাজার আর স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়নি। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। কমে গেছে লেনদেন। নতুন কোম্পানি না আসায় বাজারে ভালো শেয়ারের জোগানও বাড়ছে না। এতে একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য হারিয়ে সংকটে পড়েছে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। পুঁজিবাজারের এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার আরেকটি বড় দিক হলো শিল্পায়নে এর ভূমিকা ক্রমেই কমে যাওয়া। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ শিল্পায়নে মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ এসেছে পুঁজিবাজার থেকে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা, আর পুঁজিবাজার থেকে ৬৭৯ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা এবং পুঁজিবাজার থেকে ৬৪১ কোটি টাকা, অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকার বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক ঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করছেন। ফলে শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা কমছে। দীর্ঘমেয়াদি মেগা ঋণের পুরো বোঝা ব্যাংক খাতের ওপর পড়ায় খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটও জটিল হচ্ছে। তাদের মতে, বড় প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নের একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের পর পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমিত পোদ্দার ঢাকা পোস্টকে বলেন, নতুন ব্যবসায়িক প্রকল্প বা শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নের একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণ করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি মোট অর্থায়নের ৬০ শতাংশ ব্যাংক ও ৪০ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে নেওয়ার নিয়ম করার কথা বলেন। তার মতে, বর্তমান তারল্য সংকটে শুধু ব্যাংকের পক্ষে উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।
শুধু অর্থায়নের ক্ষেত্রেই নয়, পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও স্থবিরতার প্রভাব স্পষ্ট। ডিএসইর গত এক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৩৮টি লেনদেন দিবসে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬০২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৭৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা। অথচ বাজারে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে টিকে থাকতে দৈনিক অন্তত ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৫৬৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এক বছর পর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৭৫৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা হলেও সংশ্লিষ্টদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রার তুলনায় তা অনেক কম। গত এক বছরে কয়েক দিন লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও সেই গতি স্থায়ী হয়নি। সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে চলতি বছরের ১২ জুলাই, যার পরিমাণ ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর, যা পরিমাণ ২৬৭ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
লেনদেন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ঢাকার নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে একসময় পুঁজিবাজারের প্রায় ১২০টি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকলেও এখন প্রায় ৬৫টির মতো রয়েছে। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান অফিস সরিয়ে নেওয়ার কল্পনা করছে। মতিঝিলের পুরোনো ডিএসই ভবনেরও প্রায় ৩০ শতাংশ অফিস স্পেস খালি পড়ে আছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে শেয়ারবাজারের দৈনিক লেনদেন ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর ভালো মানের ১০ থেকে ১২টি আইপিও বাজারে আনতে হবে। তা না হলে ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
লেনদেনের বড় অংশই এখন কয়েকটি শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। এসবিএসি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নাসির উদ্দিনের মতে, বাজারের মোট লেনদেনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে হচ্ছে। এতে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
সংকটের চিত্র পাওয়া যায় একটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের মালিকের বক্তব্যেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের একসময় ৫ হাজার বর্গফুটের অফিস ছিল। এখন তা ছোট করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৫২ থেকে কমিয়ে ২৫ জনে আনা হয়েছে। বাজার খারাপ থাকায় সঞ্চিত রিজার্ভ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ করে বেতন-বোনাস দিতে হয়েছে। সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় অফিস ছোট করার পাশাপাশি কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে।
আড়াই বছর ধরে নতুন কোম্পানির খরা
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির সংকট। বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের। এরপর চলতি বছরের এসএমই প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি কোম্পানিকে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার বা কিউআইও অনুমোদন দেওয়া হলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন কোনো আইপিও অনুমোদন হয়নি। নতুন কোম্পানি না আসায় পুঁজিবাজারের পরিধিও বাড়ছে না।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আইপিও অনুমোদন হয়ে বাজারে আসতে সর্বনিম্ন ১৫ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ ব্যাংকে আবেদন করলে তিন সপ্তাহেই ঋণ পাওয়া সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ তিন মাস লাগে। ফলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার মতে, আইপিও প্রক্রিয়া তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা গেলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে।
তবে দীর্ঘ খরা কাটাতে এবার আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএসইসি ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ’ বিধিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কোনো কোম্পানি আইপিও ছাড়াই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।
বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, দেশে দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনাকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র্যানকম মোটরবাইক লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোমসহ ডজনখানেক কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুঁজিবাজারে শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিও কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি বন্ড বাজার শক্তিশালী করা ও করপোরেট বন্ডের প্রবাহ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুশাসন ও ভালো শেয়ারের ঘাটতিও বড় সমস্যা
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এক ধরনের ‘নন-ফাংশনাল মার্কেট’ বা অকার্যকর বাজারে পরিণত হয়েছে। তার মতে, এর মূল কারণ সুশাসনের অভাব ও নিয়ন্ত্রণমূলক দুর্বলতা। নতুন কমিশনের ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগে বাজারের দীর্ঘ খরা কাটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ভালো শেয়ারের ঘাটতি। বাজার অতিমাত্রায় ইকুইটিনির্ভর হলেও বন্ড মার্কেট ও মিউচুয়াল ফান্ড শক্তিশালী হয়নি। অতীতে আসা অনেক আইপিও মানহীন হওয়ায় কিছুদিন পর লোকসানি বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ভালো কোম্পানির শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এদিকে দীর্ঘদিনের মার্জিন ঋণ, ঋণাত্মক ইক্যুইটি ও প্রভিশন ঘাটতিও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত স্টকব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ঋণাত্মক ইক্যুইটি ও অনাদায়ি লোকসানের বিপরীতে মোট প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ পুঁজিবাজারের সংকট কেবল লেনদেন কমে যাওয়ার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পায়নের অর্থায়ন, ভালো কোম্পানির ঘাটতি, দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়া, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বসংকট এবং বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা। এখন আইপিও সহজ করা ও সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে দীর্ঘ খরায় থাকা পুঁজিবাজারের পরবর্তী গতি।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন