প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ০১:৩৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের সাধারণ মানুষ তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ খাবার কিনতেই ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি। খাদ্যের দাম বাড়ার পেছনে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং অসাধু সিন্ডিকেটও ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি। সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মন্ডলসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে খাদ্যপণ্যের দামে সামান্য পরিবর্তন হলেও তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়ে।
গবেষণায় বলা হয়, মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষের প্রকৃত আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় আয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মানুষ।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় চার বছর ধরে এটি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
খাদ্যের দাম কেন বাড়ছে, তা শুধু উৎপাদন খরচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণের পাশাপাশি দুর্যোগ, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও প্রতিযোগিতার মতো বিষয়ও জড়িত।
কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানোর পথে বিভিন্ন স্তরের অংশগ্রহণের কারণে দাম ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয় বলেও জানান তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে দারিদ্র্যের ঝুঁকিও বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যে ব্যয় করে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ নিম্নআয়ের মানুষের ওপরই পড়ছে।
সিপিডির গবেষণায় ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, খামার পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসার পর সবুজ মরিচের দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ, চালের ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ, ডালের ৭৮ শতাংশ, বেগুনের ৭২ শতাংশ এবং আলুর ৫০ শতাংশ। এছাড়া ডিমের দাম ২৫ শতাংশ, মুরগির ২২ শতাংশ, গরুর মাংসের ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।
সিপিডি বলছে, সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী থাকলেই তারা মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে বাজারের প্রতিটি স্তরকে দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালনা করা জরুরি। পাশাপাশি মজুতদারি, বাজারে আধিপত্য ও অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন