মো. সাজ্জাদ হোসেন শাহ্, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

প্রকাশিত: ১১ ঘন্টা আগে, ০৪:৩২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

দুই বছর ধরে এক শিক্ষকেই চলছে হাওরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

 নিজের বেতন থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ > ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে স্কুলে আসে শিশুরা হাওরের উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় বিদ্যালয়টিতে। বর্ষায় চারদিকে শুধু পানি, আর সেই পানির মাঝেই শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন একজন শিক্ষক। গত দুই বছর ধরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের দুর্গম দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একাই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শিক্ষক সংকটের কারণে নিজের বেতনের অর্থ থেকে মাসে তিন হাজার টাকা দিয়ে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম হাওরাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিদ্যালয়টি কার্যত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরেই রয়ে গেছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম থাকে না বলেও দাবি তাদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের নানা উদ্যোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১০৯ জন। অথচ পুরো বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন সহকারী শিক্ষক আব্দুল হান্নান। তিনিই প্রতিদিন বিদ্যালয় খোলা ও বন্ধ করা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও নামানো, শ্রেণি পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ, বেতন উত্তোলন এবং উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় অংশগ্রহণসহ সব দায়িত্ব একাই পালন করছেন।

শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, বিদ্যালয়ে যাতায়াতও শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২২ ফুট দীর্ঘ একটি বাঁশের সাঁকো পার হয়েই শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। সামান্য অসাবধানতায় যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

দুর্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের অন্যান্য বিদ্যালয়ে শিক্ষা কর্মকর্তাদের পরিদর্শন দেখা গেলেও দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তারা খুব কমই আসেন। বিদ্যালয়টি দুর্গম এলাকায় হওয়ায় পরিদর্শনের তালিকায় এটি অনেক সময়ই থাকে না। ফলে বছরের পর বছর শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যা অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।

একই গ্রামের ফারুক মিয়ার ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শনে এলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট অনেক আগেই সমাধান হতে পারত।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য শফিক মিয়া বলেন, শিশুদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এখানে একটি স্টিলের ফুটব্রিজ বা পন্টুন ব্রিজ নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে।
বিদ্যালয়ের একমাত্র সহকারী শিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, “২০২৫ সালের ২৫ মে এই বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে একাই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি।

বাড়ি এখানেই হওয়ায় দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারিনি। পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক কাজও আমাকে করতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজের বেতনের টাকা থেকে মাসে তিন হাজার টাকা দিয়ে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করেছি।”
তিনি আরও বলেন, মাসিক সমন্বয় সভায় অংশ নিতে বা বেতন তুলতে উপজেলায় গেলে বিদ্যালয়ের পাঠদান যাতে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়, সে কারণেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরওয়ার লিটন জানান, তাহিরপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের জন্য সাতটি ক্লাস্টার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র পাঁচটি। প্রতিটি ক্লাস্টারে একজন করে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার বিধান থাকলেও বর্তমানে পাঁচটি ক্লাস্টার পরিচালনা করছেন মাত্র একজন কর্মকর্তা। এতে বিদ্যালয়গুলোর তদারকি কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাহিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজন কুমার সাহা বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, শুধু দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, উপজেলার শরিফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট সাতটি বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ শেষে কর্মস্থলে যোগদান করলে যেসব বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে, সেসব বিদ্যালয়ে দ্রুত শিক্ষক পদায়নের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু শিক্ষক নিয়োগই নয়, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকিও জরুরি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, অবিলম্বে বিদ্যালয়টিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে একটি স্থায়ী স্টিল বা পন্টুন ব্রিজ নির্মাণ করা হোক। তাহলেই দুর্গম হাওরের শিশুদের শিক্ষাজীবন কিছুটা হলেও নিরাপদ ও স্বাভাবিক হবে।

বাংলাধারা/মফস্বল/রিয়ন

মন্তব্য করুন