বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ০৯:০৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রামের বৃক্ষমেলায় দামি ‘বনসাই’ ইনডোর প্ল্যান্টের ‘বড় বাজার’

ছবি; সংগৃহিত

 চট্টগ্রামের লালদীঘি বৃক্ষমেলায় একটি স্টলের সামনে দাঁড়াতেই চোখ আটকে গেল। ছোট টবে রাখা পরিপূর্ণ একটি বটগাছের ‘বনসাই’। থমকে গেলাম, প্রথম দেখাতেই মনে হলো, এ যেন ছোট্ট টবের মাঝে একখণ্ড বিশাল প্রকৃতি। ক্ষুদ্র অবয়ব অথচ ডালপালার বিন্যাসে কত গভীর সৌন্দর্য। বয়সের ছাপমাখা কাণ্ড, নিপুণভাবে ছড়িয়ে থাকা শাখা আর সবুজ পাতার মায়াবী আবেশ গাছের মেলায় সে চারদিকে ছড়িয়েছে অপার্থিব সৌন্দর্য।
‘জান্নাতশপ ডট সিটিজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান মেলায় নিয়ে এসেছে ‘চায়নিজ বনসাই’ এর শহরের অভিজাত ফ্ল্যাটের ভেতরে (ইনডোর) এক টুকরো বনের আবেশ দেওয়া এই বামনবৃক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম বাসকে জানান, এই ‘বনসাই’টির বয়স এখন ৪৭ বছর।’ বয়স শুনে আরও অবাক হলাম, ‘এত বছর ধরে টবে এই গাছ এই অবস্থায় কিভাবে থাকছে?’ প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিত জানালেন তাওয়াবুল। তিনি বলেন, ‘বনসাই হলো একটি জীবন্ত শিল্প। শক্ত কাণ্ড বা ডালপালা বিশিষ্ট কোনো গাছকে বিশেষ কৌশল ও পরিমিত যত্নের মাধ্যমে টব বা পাত্রে কৃত্রিম উপায়ে খর্বাকৃতি বা বামনাকৃতির করে রাখা হয়। এটি জিনগতভাবে ছোট জাতের গাছ নয় বরং বড় হতে পারা সাধারণ গাছকেই ছাঁটাই ও পরিচর্যার মাধ্যমে ছোট রাখা হয়।’
তিনি জানান, এই বনসাইয়ের দাম ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এটি তার স্টলে সর্বোচ্চ দামি। আরও কয়েক প্রজাতির গাছের বনসাই আছে তার কাছে। সেগুলোর দাম সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭০ হাজার টাকার মধ্যে।
চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউ আবাসিক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আত-তাওয়াবুল ইসলাম আরও জানান, এটা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যগত শখের পেশা। বনসাই তৈরি শুরু করেছিলেন তার দাদা, বংশ পরম্পরায় তিনি এখন তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে হাল ধরেছেন। বনসাই তৈরির কৌশলও বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা। উচ্চ শিক্ষিত তরুণ তাওয়াবুল বইসাই তৈরি ও বিক্রিকে মর্যাদাপূর্ণ কাজ বলেই মনে করেন।
এত দামি গাছ কারা কিনেন, কেন কিনেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শহরের অভিজাত ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, বৃক্ষপ্রেমী মানুষ এসব গাছের প্রধান ক্রেতা, তারা এগুলোর দরদামও খুব একটা করেন না। ঘরের ভেতরে সৌন্দর্যের আবেশ ছড়াতে, ভেতরের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে বনসাইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।’
বৃক্ষমেলায় বিভিন্ন নার্সারির মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরে গাছ লাগানোর মতো জায়গার বড় সংকট। বাড়িগুলোতে আঙিনা নেই, চারপাশে জায়গা খালি নেই কিন্তু মানুষের গাছ লাগানোর আগ্রহ থেমে নেই। সে কারণে ছাদবাগান ও টবে গাছ লাগানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। একই সাথে বনসাই ও ইনডোর প্ল্যান্টের ‘বড় বাজার’ তৈরি হয়েছে। এখন শহরের বাসাবাড়ি-ফ্ল্যাটে বসবাসকারী মানুষজন ঘরের ভেতরে ‘জীবন্ত সবুজ গাছ-পাতাবাহার ফুল রাখাকে দারুণ শখ এবং ঘর দুষণমুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখছেন।
‘তরুবন’ নার্সারির স্বত্ত্বাধিকারী এস এম ইমাম হোসাইন বাসসকে বলেন, ‘গাছ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবং চাহিদা বদলে গেছে। এখন মানুষ ঘরের ভেতরে ছোট সবুজ গাছ রাখতে চাইছেন। রঙিন ফুলের গাছ, বিভিন্ন প্রজাতির পাতাবাহার, বিভিন্ন ধরনের শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ, ইনডোর প্ল্যান্ট এখন চাহিদার শীর্ষে । বটবৃক্ষের মতো গাছের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশ ভালো। অনেকেই নাম শুনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে এসে গাছ খুঁজছেন। তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের গাছ সংগ্রহের প্রবণতা বেশি।’
তিনি জানান, ঘরের ভেতরে রাখার ছোট পাতাবাহার ও ফুলের গাছের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী মানুষ এসব গাছ কিনছেন। তাদের কাছে গাছ এখন শুধু বাগানের বিষয় নয়, ঘরের সৌন্দর্য ও মানসিক প্রশান্তিরও অংশ। জাত ও আকার ভেদে ইনডোর প্ল্যান্ট ও ক্যাকটাস উদ্ভিদ প্রতিটি সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিনেও তার সেই বক্তব্যের মিল দেখা গেল, বনসাই আর ইনডোর প্ল্যান্টগুলো ঘিরে মানুষের জটলা বাঁধছে। মেলার কোলাহলের মাঝে এগুলোর সামনে এসে থেমে যাচ্ছিল মানুষের চোখ। কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পছন্দ করে কিনে নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ ঘরের জন্য, কেউ ড্রয়িংরুমের কোণের জন্য, কেউ অফিসের ডেস্কের জন্য, আবার কেউ কেউ বারান্দায় সাজানোর জন্য এক সঙ্গে কয়েকটি কিনছেন।
বনসাই (বানজাই বা বনজাই) শব্দটি একটি জাপানি শব্দ, যার বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘জীবন্ত ভাস্কর্য’। স্বাভাবিকভাবে তাই বনসাইকে জাপানে উদ্ভূত একটি শিল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, বনসাইয়ের প্রচলন আসলে শুরু হয় চীনে। প্রায় ২০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে চৈনিক সাম্রাজ্যের সময়ে সেখানকার লোকজন ছোট ছোট পাত্রে খর্বাকৃতির গাছ চাষের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে জাপানি জেন বৌদ্ধগোষ্ঠী একে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যায়। 

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন