প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৫:২৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার নামে ঘরে। কিন্তু বিদ্যুতের সংকট যখন দীর্ঘ হয়, তখন শুধু ঘর নয়, অন্ধকার নেমে আসে মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ওপরও। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা, কখনো আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা, আবার কখনো কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এখন অনেক মানুষের কাছে নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত বিদ্যুৎকেন্দ্র, এত বিনিয়োগ, এত উৎপাদন সক্ষমতার পরও কেন এই সংকট? সমস্যাটা কি কেবল জ্বালানি সংকটের কারণে, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সম্পর্ক সরাসরি। গ্যাস, কয়লা কিংবা তরল জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে যতই বেশি থাকুক, বাস্তবে তার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকবে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র কয়লার অভাবে উৎপাদন কমাবে, আর তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র চালাতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
সুতরাং বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্বালানি সংকট কি আকস্মিক কোনো ঘটনা? নাকি দীর্ঘদিন ধরে জানা একটি সমস্যার যথাযথ সমাধান করা হয়নি?
এখানেই আলোচনাটি ব্যবস্থাপনার দিকে চলে যায়।
একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে চলে না। উৎপাদন, জ্বালানি, সঞ্চালন, বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক পরিকল্পনা, সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হয়। এই চেইনের যেকোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হলে পুরো ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।
আমাদের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে, পুরোনো কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ দেশের বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্য উৎপাদন এক বিষয় নয়।
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াট হলেই যে সেটি সব সময় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি না থাকলে কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে। আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর মতো সঞ্চালন বা বিতরণ অবকাঠামো না থাকলেও সেই উৎপাদন বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না।
তাহলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, এতদিন আমরা কি শুধু সক্ষমতা বাড়ানোর হিসাব করেছি, নাকি সেই সক্ষমতাকে নির্ভরযোগ্য করার ব্যবস্থাও করেছি?
বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাধ্য করছে।
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। একজন ধনী ব্যক্তি বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেন। বাসা বা প্রতিষ্ঠানে জেনারেটর, আইপিএস কিংবা সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারেন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও নিজেদের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখতে পারে। কিন্তু একজন নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বারবার বিকল্প ব্যবস্থা করা সহজ নয়।
বিদ্যুৎ না থাকলে একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। একজন অনলাইনকর্মীর কাজ থেমে যায়। ছোট দোকানের ব্যবসা ব্যাহত হয়। ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। গরমের রাতে শিশু ও বয়স্ক মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
এই ক্ষতিগুলোর অনেকটাই বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবের খাতায় আসে না। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ে।
একটি ছোট কারখানার মেশিন কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে হয়তো জাতীয় পর্যায়ে তা বড় সংখ্যা মনে হয় না। কিন্তু হাজার হাজার ছোট কারখানা, দোকান, ওয়ার্কশপ, রেস্টুরেন্ট, কৃষি খামার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা যখন একই সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন তার সম্মিলিত অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল।
কৃষিতেও বিদ্যুতের গুরুত্ব অপরিসীম। সেচের সময় বিদ্যুৎ না থাকলে কৃষককে বাড়তি খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের প্রভাব বাজারেও পড়ে।
আর শিল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কোনো উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না থাকেন যে তাঁর কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন করতে পারবে, তাহলে তিনি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, তা হলো জবাবদিহি।
বিদ্যুৎ সংকট হলে জনগণ শুধু বিদ্যুৎ চায় না, তারা জানতে চায় কেন বিদ্যুৎ নেই। কতদিন এই পরিস্থিতি চলবে? কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ? কেন বন্ধ? জ্বালানি সংকটের কারণ কী? কোথায় সরবরাহের সমস্যা? সংকট মোকাবিলায় কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে?
এই তথ্যগুলো যত বেশি স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে আসবে, মানুষের আস্থাও তত বাড়বে।
কিন্তু বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর গ্রাহক যদি শুধু অপেক্ষা করেন এবং কখন বিদ্যুৎ ফিরবে তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য না পান, তখন ভোগান্তির সঙ্গে ক্ষোভও তৈরি হয়।
আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, গ্রাহক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় কখন লোডশেডিং হতে পারে, সম্ভাব্য সময়সূচি কী, কোন এলাকায় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে, কোন কারণে সরবরাহ বন্ধ, এসব তথ্য দ্রুত জানানো উচিত।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়বে, এটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। শিল্পায়ন বাড়বে, শহর বাড়বে, মানুষের জীবনযাত্রায় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। আগামী পাঁচ কিংবা দশ বছর পর কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, তার হিসাব করেই জ্বালানি, উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে।
শুধু চাহিদা বাড়ার পর নতুন কেন্দ্র বানানোর উদ্যোগ নিলে হবে না। আগেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোন উৎস থেকে কত জ্বালানি আসবে, দেশীয় উৎসের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কতটা বাড়ানো সম্ভব, এসব নিয়েও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু ও অন্যান্য বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। একমাত্র এই উৎস দিয়ে জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ খাতকে রাজনৈতিক সাফল্যের প্রচারণার বিষয় না বানিয়ে জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা যোগ হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, মানুষ কতটা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পেল।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে, বিনিয়োগ হয়েছে, সক্ষমতা বেড়েছে, এসব অবশ্যই ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু সেই অর্জন তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন সাধারণ মানুষ দিনের শেষে সুইচ চাপলে আলো পাবেন এবং একজন উদ্যোক্তা নিশ্চিন্তে তাঁর প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবেন।
বর্তমান বিদ্যুৎ বিপর্যয় তাই আমাদের জন্য শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে, ব্যবস্থাপনার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে।
কারণ জ্বালানি সংকট হয়তো আজ আছে, কাল কমবে। কিন্তু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে গেলে সংকট আবার ফিরে আসবে।
আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি প্রতিবার সংকট তৈরি হওয়ার পর অস্থায়ী সমাধান করব, নাকি সমস্যার মূল জায়গায় হাত দেব?
বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তারা নিয়মিত বিল দেন, বিনিময়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ চান। একজন শিক্ষার্থী পড়ার সময় আলো চান, একজন কৃষক সেচের সময় বিদ্যুৎ চান, একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা সচল রাখতে বিদ্যুৎ চান, একজন শিল্পোদ্যোক্তা উৎপাদন চালাতে বিদ্যুৎ চান।
এই চাহিদা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক প্রয়োজন।
তাই আজকের বিদ্যুৎ বিপর্যয় আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে দাঁড় করিয়েছে, সেটি হলো: সংকট কি সত্যিই শুধু জ্বালানির, নাকি আমাদের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ বিদ্যুতের সংকট শুধু অন্ধকার তৈরি করে। আর ব্যবস্থাপনার সংকট তৈরি করে অনাস্থা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা নয়, সেই বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া। আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সমালোচনা হবেই। কারণ উন্নয়নের সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষা কোনো পরিসংখ্যানে নয়, সাধারণ মানুষের ঘরের বৈদ্যুতিক সুইচে।
আলো জ্বলার নিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন