বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ০১:১৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মুন্সীগঞ্জে সবজি চারার জমজমাট বাজার, মৌসুমে বিক্রির আশা ২০ কোটি টাকা

ছবি; সংগৃহিত

শীত আসতে এখনও কিছুটা সময় বাকি। অথচ এরই মধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে মুন্সীগঞ্জের সবজি চারার বাজারে। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত জমিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চারা উৎপাদনকারীরা। বাঁশের চাটাইয়ের নিচে যত্নে বেড়ে উঠছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন ও মরিচের চারা। জেলার বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি এসব চারা যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। কয়েক মাসের এই মৌসুমি বেচাকেনায় কোটি কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন উৎপাদনকারীরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব চারা এখন যাচ্ছে সাভার, শরিয়তপুর, মাদারীপুর নারায়নগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দূর-দুরান্ত থেকে পাইকার ও চাষিরা মুন্সীগঞ্জে এসে বীজতলা থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন এসব চারা।  কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী মাত্র তিন-চার মাসের এই মৌসুমেই ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয় মুন্সীগঞ্জ থেকে। বাঁশের চাটাইয়ের নিচে লালন করা হচ্ছে কোটি টাকার স্বপ্ন।
সরেজমিনে পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যেরবাগ ও কেপিবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ততার চিত্র। কেউ চাটাই সরিয়ে চারায় পানি দিচ্ছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ নতুন বীজতলা তৈরি করছেন। শিশুর মতো পরম মমতায় লালন পালন করতে হয় এ সমস্ত চারাগুলোকে। খুব সকালে উঠে চাষিরা চারাগাছগুলোর উপর থেকে বাশেঁর চাটাইগুলো সরিয়ে রোদ্রে দেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে যখন রৌদ্র কিরণ বাড়ে তখন আবার ঢেকে দেন চাটাই দিয়ে। এছাড়া নিয়মিত পানি, নতুন মাটি, সার খৈল প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার করতে হয়।
চারাচাষী মাসুম শিকদার বলেন, প্রায় একমাস আগে চারা উৎপাদন পক্রিয়া শুরু করি। বর্তমানে কিছু কিছু বীজতলা থেকে চারা বিক্রি করছি। যে বীজতলা থেকে চারা বিক্রি করছি, সেগুলোতে আবারও বীজ বপন করছি। এভাবে প্রতিবছর প্রতি বীজতলা থেকে ২-৪ বার আমরা চারা বিক্রি করে থাকি। দেশের বিভিন্ন স্থানে থেকে লোকজন এসে আমাদের কাছ থেকে এ সমস্ত চারা কিনে নিয়ে যায়। চাষী আবু সাঈদ বলেন, এ বছর প্রতি হাজার চারা ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। প্রকারভেদে এক হাজার চারা ২০০০ টাকাও বিক্রি হয়।
চারাচষী কামাল শিকদার বলেন, আমরা যে চারাগুলো চাষ করি সেগুলোর বেশির ভাগই বীজ আসে বিদেশ থেকে। আগে জাপানি বীজই আমরা বেশি ব্যবহার করতাম। বর্তমানে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বীজ আমরা ব্যবহার করি । এসব বীজের দাম প্রচুর। ১০ গ্রাম বীজ ১৫০০ টাকা দিয়েও কিনতে হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, প্রতিবছর প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাতের চারা উৎপাদন। এক কেজি উন্নত জাতের বীজের দামই এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।
চারা ব্যবসায়ীরা বলেন, মুন্সীগঞ্জের চারা দিয়ে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পান। তাই দেশের বিভিন্ন জেলায় এর চাহিদা। স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে চারা উৎপাদন হয়। ধীরে ধীরে খৈল, জৈব সার ও পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করে মান বাড়ানোয় এখন পঞ্চসার, বজ্রযোগিনী ও রামপালে দেড় শতাধিক ছোট-বড় চারা প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ২৫-৩০ জন উদ্যোক্তা এখন সারা বছরই মানসম্মত চারা উৎপাদন করছেন। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে উৎপাদন শুরু হয়ে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিক্রির ধুম লাগে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিন-চার দফায় চলে এই বেচাকেনা। বীজ বপনের পর চারা বিক্রির উপযোগী হতে সময় লাগে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ দিন। এই সময়টা কৃষকদের চোখে ঘুম থাকেনা।
নিজাম মিয়া বলেন, চারা উৎপদানে ব্যাপক শ্রম দিতে হয়। অতি রৌদ্র চারাগুলো সহ্য করতে পারে না। তাই দুপুর হলে ঢেকে রাখি। সকাল-বিকেলে চাটাই সরিয়ে চারাগুলোকে রোদ দেই। একটু এদিক-সেদিক হলেই সব শেষ। ভারী বৃষ্টিপাত ও  ঝড় তুফান হলো চারার সবচেয়ে বড় শত্রু। ঝড় হলে আমাদের ঢেকে রাখা চাটাইগুলো উড়ে যায়। তখন বৃষ্টির পানি পরে চারাগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
শ্রমিক আতিক হাসান বলেন, আমার বাড়ি নেত্রকোণার দুর্গাপুর। আমি প্রতিবছর এ মৌসুমে ৩ মাস এ এলাকায় চারার কাজ করি। আমি কাজে অভিজ্ঞ হওয়ায় প্রতিমাসের ২০ হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক দেয়। পাঁচ বছর যাবত এখানে কাজ করছি আমি।
তিন আরও বলেন, এ বছর আমাদের চারাগুলো ইতোমধ্যে বিক্রির উপযোগী হয়ে গেছে। বিক্রিও চলছে। ঢাকা নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের লোকজন ছুটে আসছেন চারা নিতে। জাত ভেদে চারার দাম কমবেশি রয়েছে। বেগুন টমেটো চারা প্রতি পিস ৫ টাকা করে  বিক্রি করছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, মুন্সীগঞ্জের চারা একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ২৫-৩০জন উদ্যেক্তা নিয়মিত চারা উৎপাদন করছেন । নেত্রকোণা, ময়মনসিংহসহ জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকদের দিয়ে এ এলাকার উদ্যোক্তারা এ  সমস্ত চারা উৎপাদন করছেন। এ চারাগুলো ঢাকার সাভার, মানিকগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানের মানুষ এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে যে চারাগুলো উৎপাদন হয় তা বেদেশী জাতের ভালো বীজ দিয়ে উচ্চ ফলনশীল চারা উৎপাদন  করায় এর চাহিদা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কৃষির একটি নব-দিগন্তের সূচনা হচ্ছে

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন