প্রকাশিত: ৪৮ মিনিট আগে, ১০:৪৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
শরৎ মানেই নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর প্রকৃতির নতুন সাজ। বর্ষার রুক্ষতা কাটিয়ে এ সময় পাহাড়ি প্রকৃতি যেন ফিরে পায় তার নির্মল ও স্নিগ্ধ রূপ। নীল আকাশের নিচে সারি সারি সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা আর জুমের ক্ষেতের সবুজ-সোনালি আভা সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করতে শরতে পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তেরাং তৈকালাই ঝর্ণা, যা রিছাং ঝর্ণা নামেও পরিচিত। পাহাড়, ঝর্ণা, নীল আকাশ ও মেঘের মিতালিতে সাজানো এই পর্যটনকেন্দ্র শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য।
বর্ষাকালে পাহাড়ি ঝর্ণায় পানির প্রবাহ বেড়ে গেলেও অতিবৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আবার শীতকালে অনেক ঝর্ণার পানিপ্রবাহ কমে যায়। এ কারণে বর্ষার পানি কিছুটা কমে আসার পর শরতের নির্মল আকাশ ও স্নিগ্ধ পরিবেশে রিছাং ঝর্ণা ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে উপভোগ্য।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা পাহাড়ের হৃদয় মেম্বার পাড়া এলাকায় পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসে রিছাং ঝর্ণা। স্থানীয় ত্রিপুরা ভাষায় ঝর্ণাটি ‘তেরাং তৈ কালাই’ নামেও পরিচিত।
পাথুরে ঢাল বেয়ে স্বচ্ছ পানির ধারা নিচে নেমে আসার দৃশ্য এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ঝর্ণার পানির কলকল শব্দ, পাহাড়ের সবুজ আর নির্মল বাতাস মিলে তৈরি করে এক শান্ত ও মনোরম পরিবেশ। কিছুক্ষণ ঝর্ণার পাশে দাঁড়ালেই শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে যেন আলাদা এক জগতে চলে যাওয়ার অনুভূতি হয়।
ঝর্ণার চারপাশের পাহাড়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও নিচু টিলা, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢালে দেখা যায় জুমের ক্ষেত। শরতে জুমের ধানগাছ ধীরে ধীরে সবুজ থেকে সোনালি রং ধারণ করতে শুরু করে। ফলে পাহাড়ের সবুজের সঙ্গে জুমের সোনালি আভা যোগ হয়ে পুরো এলাকাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
পাহাড়ি সড়ক ধরে রিছাং ঝর্ণার দিকে এগোতে গেলে দুই পাশে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে, যা পথকেও ভ্রমণের অংশ করে তোলে। মাথার ওপর গাঢ় নীল আকাশ। সেই নীলের বুকে তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় শুভ্র মেঘ। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় প্রকৃতির এই রূপ পর্যটকদের বারবার থামিয়ে ছবি তুলতে বাধ্য করে।
মূল সড়ক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার পর পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়। যত নিচে নামা যায়, পাহাড়ের সবুজের ফাঁক দিয়ে ততই স্পষ্ট হতে থাকে ঝর্ণার জলধারা। একপর্যায়ে সামনে দেখা দেয় পাথরের ওপর দিয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা।
দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার ক্লান্তি তখন অনেকটাই ভুলে যান দর্শনার্থীরা। ঝর্ণার শীতল পানির শব্দ, পাথরের ওপর দিয়ে পানির ছুটে চলা এবং চারপাশের সবুজ পাহাড় মিলে তৈরি করে ভিন্ন এক আবহ।
ঝর্ণার স্বাভাবিক গতিপথে পাথুরে ঢাল তৈরি হওয়ায় পানির ওপর দিয়ে গড়িয়ে নামার মতো প্রাকৃতিক জলস্লাইডও রয়েছে এখানে। এ কারণে ঝর্ণার পানিতে ভেজা ও আনন্দ করার পাশাপাশি এটি শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে পাহাড়ি ঝর্ণায় আনন্দ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা। পাথরে শ্যাওলা থাকায় এগুলো অনেক সময় অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে থাকে। বিশেষ করে পানির স্রোত বেশি থাকলে পাথুরে ঢালে ওঠানামা কিংবা পানির ওপর দিয়ে গড়িয়ে নামার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
শরতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন রিছাং ঝর্ণায়। বৈরব থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আফরোজা আক্তার লাভলি বলেন, প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি বেড়াতে এসেছি। আজ ঝর্ণায় আসলাম। রিছাং ঝর্ণা অসম্ভব সুন্দর।
নরসিংদী থেকে বেড়াতে আসা নাইম বলেন, ঝর্ণায় আসার পথে দুই পাশের পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। ঝর্ণায় এসে প্রাণ জুড়িয়ে গেছে। স্বচ্ছ শীতল ঝর্ণার পানিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে।
পর্যটকদের মতে, শুধু ঝর্ণাই নয়, রিছাংয়ে যাওয়ার পথের পাহাড়ি প্রকৃতিও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘ, সবুজ পাহাড় এবং জুমের ক্ষেতের দৃশ্য ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়।
রিছাং ঝর্ণার পাহাড়ের আরও কয়েকশ মিটার নিচে রয়েছে আরেকটি ঝর্ণা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি আকারে রিছাং ঝর্ণার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উঁচু এবং দেখতেও বেশ আকর্ষণীয়।
তবে দ্বিতীয় ঝর্ণাটিতে যেতে হলে দুর্গম জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হয়। ফলে পর্যটকদের বড় একটি অংশ চাইলেও সেখানে যেতে পারেন না। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দাবি, সেখানে যাতায়াতের জন্য সিঁড়ি নির্মাণ করা হলে এবং ঝর্ণাটির আশপাশে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে নতুন একটি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে এটি গড়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, পাশাপাশি দুটি ঝর্ণাকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে রিছাং এলাকায় পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়নে জেলা প্রশাসন সবসময় তৎপর রয়েছে। নতুন কোনো স্পটে স্থানীয় জনসাধারণ এবং পর্যটনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে যাতায়াতের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে।
তেরাং তৈকালাই বা রিছাং ঝর্ণা খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা পাহাড়ের হৃদয় মেম্বার পাড়া এলাকায় অবস্থিত। মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে খাগড়াছড়ির দিকে মূল সড়ক ধরে এগোলে ঝর্ণাটির প্রবেশপথে পৌঁছানো যায়। মাটিরাঙ্গা সদর থেকে ঝর্ণাটির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার।
খাগড়াছড়ি-ঢাকা মহাসড়ক থেকে ঝর্ণার দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে যেতে হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, জিপসহ বিভিন্ন যানবাহনে ঝর্ণার গেট পর্যন্ত যাওয়া যায়। এরপর পায়ে হেঁটে অথবা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে ভেতরের পথে যেতে হয়।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকেও সহজে রিছাং ঝর্ণায় যাওয়া যায়। জেলা সদর থেকে ঝর্ণাটির দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় একই ভ্রমণে আলুটিলাসহ আশপাশের অন্যান্য পর্যটন স্পটও ঘুরে দেখা সম্ভব।
শরতের নির্মল আকাশ, মেঘের ভেলা, পাহাড়ের সবুজ আর ঝর্ণার স্বচ্ছ জলধারা সব মিলিয়ে তেরাং তৈ কালাই এখন প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন