প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:২৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগের সক্ষমতা ও গতি বাড়াতে ২০১২ সালে হাতে নেওয়া হয়েছিল ‘ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেলপথ সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। ঢাকা-টঙ্গী অংশে তৃতীয় ও চতুর্থ এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশে দ্বিতীয় ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সেবা দেওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তিন বছরে শেষ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১৪ বছরেও শেষ হয়নি কাজ। নকশা পরিবর্তন, কাজের পরিধি বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি এখনও ঝুলে আছে। ৮৪৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় দুই দফা সংশোধনের পর বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪২ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ এক যুগে বাস্তবায়নের খরচ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা বা ২৯৪ শতাংশ। বর্ধিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৫২১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৮২১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
২০১২ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ছিল তিন বছর। পরে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা স্টেশন সংস্কারসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে আরও দুই বছর সময় প্রয়োজন। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করার পরিকল্পনা করছে।
রেলওয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে ভৌত অগ্রগতি ৪৩.৮৬ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩৩.১৭ শতাংশ দেখানো হলেও ঢাকা পোস্ট-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫৩.৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ বর্ধিত মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসেও কাজের একটি বড় অংশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, উপযুক্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা ছাড়াই ২০১২ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে একাধিকবার নকশা ও কাজের পরিধিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ৭১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কথা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ১৩৭.৯৪১ ট্র্যাক কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়। যার মধ্যে ১০৭.৯৪১ কিলোমিটার প্রধান লাইন এবং ৩০ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং লাইন। পুরানো হিসাব ধরে একসময় অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ দাবি করা হলেও পরিধি বাড়ায় নতুন হিসাবে অগ্রগতি অনেকটাই কমে যায়।
পরামর্শক নিয়োগ, নকশা প্রণয়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া নির্ধারণ ও দরপত্র আহ্বান করতেই কেটে যায় প্রথম ছয় বছর। অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্পের বড় একটি সময় চলে যায় প্রাথমিক প্রস্তুতিতেই। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ঠিকাদারের কাঁচামাল, ফিটিংস, পাথর ও স্লিপার সরবরাহে বিলম্ব এবং করোনা মহামারিজনিত স্থবিরতায় কাজের গতি আরও কমে যায়।
প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে এর অবকাঠামোগত নকশাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে। তুরাগ নদীর ওপর টঙ্গী সেতুতে শুরুতে দুটি রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও, ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রুটে ভবিষ্যতে ভারী ও দ্রুতগতির আন্তঃনগর ট্রেনের চাপ সামলাতে এটি চার লাইনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি সেতুর উচ্চতা বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেতুটির উলম্ব উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিন মিটার। তবে নৌযান নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বার্থে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চাহিদা অনুযায়ী এই উচ্চতা আরও অন্তত দুই মিটার বাড়ানো হচ্ছে।
শুধু সেতু নয়, রেলপাতের মান ও ওজনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুরুতে প্রতি মিটারে ৪১ কেজি ওজনের রেলপাত ব্যবহারের কথা থাকলেও, ভবিষ্যতে ভারী ও দ্রুতগতির ট্রেন চলাচলের কথা বিবেচনা করে ইউআইসি ৬০ কেজি ওজনের রেলপাত ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমান অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রধান লাইন, লুপ ও সাইডিংসহ মোট ১৩৭.৯৪১ ট্র্যাক কিলোমিটার রেলপথ এই উন্নত রেলপাত দিয়ে পুনর্র্নিমাণ করা হচ্ছে।
বর্তমান ডিপিপিতে কেবল রেললাইন নয়, যুক্ত হয়েছে বিশাল অবকাঠামোগত কাজ। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বড় সেতু, ২৫টি ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ; তেজগাঁও, বনানী, টঙ্গী ও ধীরাশ্রম স্টেশন ভবন পুনর্র্নিমাণ এবং ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের সম্প্রসারণ। এছাড়া ১৪টি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, চারটি সম্প্রসারণ, নয়টি প্ল্যাটফর্ম শেড নির্মাণ ও তিনটি শেড সম্প্রসারণের কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। একই সাথে সীমানাপ্রাচীর, অ্যাপ্রোচ রোড, ড্রেন, অফিস ও আবাসিক ভবন, লেভেল ক্রসিং গেট এবং নিরাপত্তাবেষ্টনীর পাশাপাশি প্রাকৃতিক শব্দ নিরোধক হিসেবে সীমানাপ্রাচীরে ‘কার্টেন ক্রিপার’ বা লতানো গাছ লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। রেলপথ সম্প্রসারণের পাশাপাশি এ প্রকল্পে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। সাতটি স্টেশনে কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং (সিবিআই) সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বসিয়ে তা কেন্দ্রীয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার (সিটিসি) সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এছাড়া ৩৭টি লেভেল ক্রসিং গেটে বসছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এতে ট্রেনের ক্রসিংজনিত অপেক্ষার প্রহর কমবে, সাশ্রয় হবে পরিচালন ব্যয় ও সময়। ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৫৩.৬৭ শতাংশ। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ৫৩.৫০ কিলোমিটার ফরমেশন, ৫৫.৫ কিলোমিটার রেললাইন, দুটি স্টেশন ভবন, দুটি মেজর সেতু ও ১৯টি মাইনর সেতুর কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে দুটি মাইনর সেতু, দুটি স্টেশন ভবন ও প্রায় ৪ কিলোমিটার ফরমেশনের কাজ চলছে। পাশাপাশি জয়দেবপুর ও ধীরাশ্রম স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিং এবং সিগন্যাল আধুনিকীকরণের কাজও চলছে।
অর্থের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভেরিয়েশন প্রস্তাব ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হলেও অনুমোদন পেতে ২২ মাস সময় লাগে। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই অনুমোদন পাওয়ার পর ২৭ জুলাই ভেরিয়েশন চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তবে, টার্মিনাল ডিসবার্সমেন্ট ডেট (টিডিডি) বাড়ানোর অনুমোদন পেতে আরও পাঁচ মাস সময় লাগে। এ সময়ে ঠিকাদারের পাওনা বকেয়া থাকায় কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। চলতি বছরের জুলাই থেকে কাজ পুরোদমে শুরু হলেও জিওবি মূলধন খাতে বরাদ্দের তুলনায় সিডি-ভ্যাট পুনর্ভরণ বিল বেশি হওয়ায় আবারও ঠিকাদারের মালামাল সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
রেলওয়ের মহাপরিচালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অর্থায়ন ও সাইট ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন কারণে শুরু থেকেই প্রকল্পে বিলম্ব হয়েছে। ঢাকা স্টেশনসহ সব কাজ শেষ করতে আরও প্রায় দুই বছর সময়ের প্রয়োজন হবে। মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন না পেলে অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্পটি শেষ করতে হবে।’
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন