প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৭:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার ঘটনায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আতঙ্ক ও হুড়োহুড়িতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভাষ্য, আগুনের ঘটনায় কেউ মারা যাননি। যে চারজনের মৃত্যুর কথা হাসপাতালের নথিতে আছে, তাদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তা নিশ্চিত নয়।সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এতে অনেক রোগী ও স্বজন আহত হন।
এ ঘটনায় অন্তত ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। নিহতদের মধ্যে আছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহজাহান মনির (৪৫), একই উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী (৩৮) এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫) রয়েছেন। এ ছাড়া একই সময়ে নেত্রকোণার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০) নামে আরও এক নারীর মৃত্যুর তথ্য হাসপাতালের নথিতে রয়েছে। তবে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শাহজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার মেরুদণ্ডের হাড়ে যক্ষ্মা ধরা পড়েছিল। গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। পরে রাতেই তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শাহজাহান মনিরের স্ত্রী হারিসা বেগম জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি ও তার বোন স্বামীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। দুই-তিন ধাপ নামার পরই তারা পড়ে যান। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরলে স্বামীকে দেখতে পাননি। পরে জানতে পারেন, ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তার স্বামী মারা গেছেন।
হারিসা বেগম বলেন, আমি, আমার বোন আর আমার স্বামী এই তিনজন একসঙ্গে ছিলাম। আমার বোনের বুকে ব্যথা পাইছে। পরে ওরে হাসপাতালে ভর্তি রাখছে।
ছেলের মৃত্যুর পর থেকে আহাজারি করছেন শাহজাহান মনিরের মা হাওয়া খাতুন। তিনি বলেন, গতকাল (সোমবার) বিকেলেও ছেলে ফোন করে দোয়া চেয়েছিল। বলেছিল, ভালো আছে।
হাওয়া খাতুন বলেন, ‘আমার কইলজ্যার টুকরা পুত বাড়িত ঠিকই আইলো, কিন্তু লাশ হইয়া আইলো। আমার পুতে আমারে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইতো। এহন কেডা আমারে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইবো?’
মাকে বাঁচাতে পারেননি মিম
কুলসুম আক্তার ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে তিনি ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। তার সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে তার মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মিম আক্তার জানান, আগুনের কথা শুনে তিনি, তার মা ও ভাই একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। ভিড়ের মধ্যে তারা পড়ে যান। তিনি উঠে ভাইকে টেনে তুললেও মাকে তুলতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মিম বলেন, আম্মু তখন মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেছিল। আম্মু আমাকে একবার ডাক দিয়ে কইছে, ‘ও মিম, আমারে ধরলি না?’ আমি তখন মানুষের চাপের মধ্যে পড়ে গেছিলাম।
পরে মাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় বলে জানান মিম। তার অভিযোগ, দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হলে তার মা বেঁচে যেতে পারতেন।
কুলসুমের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, কুলসুম ১১-১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আগুনের সময় তিনি হাসপাতালের ভেতরেই ছিলেন। তাই তাকে বাইরে থেকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্য সত্য নয়।
আগুনের পর সিঁড়িতে আটকা পড়েন রমজান
রমজান আলী বুকের ব্যথা নিয়ে গতকাল (সোমবার) সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরে তাকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট উল্লেখ করা হয়েছে। স্বজনরা জানান, আগুনের পর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। মঙ্গলবার দুপুরে জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করার কথা।
রমজান আলীর স্ত্রী খাদিজা আক্তার জানান, আগুন লাগার পর সবাই আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেন। তিনিও সিঁড়ির মধ্যে পড়ে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানানো হলে নিচে বা ওপর কোনো দিকেই যেতে পারছিলেন না।
খাদিজা বলেন, মাঝখানে আটকা পড়ে গেছিলাম। ওই অবস্থাতেই মারা যান আমার স্বামী। আগুন না লাগলে তো এমন ঘটনা ঘটত না।
রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। আগুনের পর সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে তিনি মারা যান। পরে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে রাতেই ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সাইফুল বলেন, আমাদের হাতে ৭টা ২৫ মিনিটে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস আছে। তাহলে কীভাবে বলে, তিনি হাসপাতালে মারা যাননি?
পদদলিত হয়ে নিহতের কোনো তথ্য পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের আবরণ পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন আহত হন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই রেজিস্টারের পাতার ছবির সত্যতা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান নিশ্চিত করেছেন।
মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই রেজিস্টার করেছিলেন। তবে ওই চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। মারা যওয়া ব্যক্তিদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন