প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৩:৪৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
প্রথম শ্রেণির নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ রক্ষা এবং পৌর এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে নেত্রকোনায় নির্মাণ করা হয়েছিল ১১ কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম ও চরম গাফিলতির কারণে উদ্বোধনের পরদিনই বন্ধ হয়ে গেছে এর সার্বিক কার্যক্রম। ফলে কোটি টাকার এই স্থাপনাটি এখন রূপ নিয়েছে বিশালাকার এক ময়লার ভাগাড়ে, আর দুর্গন্ধে নাকাল হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আশপাশের বাসিন্দারা।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জমি অধিগ্রহণসহ মোট ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নেত্রকোণা পৌর শহরের বাহিরচাপড়া এলাকায় এই বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০২৪ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরিকল্পনা ছিল, পৌরসভার বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে একদিকে জৈব সার তৈরি করা হবে, অন্যদিকে পচনশীল নয় এমন বর্জ্য পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) করে আয়ের পথ সুগম হবে। অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হলেও অজানা কারণে এর পরের দিন থেকেই থমকে যায় সব কার্যক্রম।
বর্তমানে পুরো শোধনাগার এলাকাজুড়ে জমছে বর্জ্যের স্তূপ। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ছড়িয়ে পড়া উৎকট গন্ধে সাধারণ মানুষের বসবাস একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবেশ বিষিয়ে ওঠায় ইতোমধ্যে অনেকে ভিটামাটি ছেড়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় উঠতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বারবার পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে এর স্থায়ী প্রতিকার চাওয়া হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
অভিযোগ তুলে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে শোধনাগার করা হলো, তা উল্টো জীবনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত দুর্গন্ধ যে ঘরে টেকাই দায়। প্রকল্পটির পেছনের অনিয়ম তদন্ত করা এবং দ্রুত এটি চালু করার দাবি জানান তারা।
মো. ফৌজদার মিয়া নামের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, এখানে ময়লা ফেলার জন্য নিষেধ করলেও তারা শোনে না। ময়লা ফেলায় শিয়াল-কুকুরের উৎপাতের কারণে চলাচল করা যায় না। এর মধ্যে কয়েকজনকে শিয়াল-কুকুরে কামড়েও দিয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই জায়গাটা যেন পরিষ্কার করে আমাদের বসবাসের উপযোগী করে দেওয়া হয়।
রুমেল খাতুন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, আমাদের এই এলাকায় থাকতে খুব অসুবিধা হয়। মাছি ও দুর্গন্ধের কারণে বাচ্চাদের খাবার দেওয়া যায় না, খাবারের ওপর শত শত মাছি এসে বসে। দুর্গন্ধের কারণে বাচ্চারা প্রায় সময় অসুস্থ থাকে, ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারে না এবং স্কুলে যেতে পারে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই নেত্রকোণা পৌর শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪২ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। নির্ধারিত শোধনাগারটি অচল হয়ে পড়ে থাকায় এসব বর্জ্যের বড় অংশই ফেলা হচ্ছে খোলা জায়গায়, যা পুরো শহরের জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোটি টাকার অবকাঠামো পড়ে থাকার বিষয়ে নেত্রকোণা পৌরসভার প্রশাসক মুনমুন জাহান লিজা জানান, সম্প্রতি আমি পৌরসভার দায়িত্ব নিয়েছি। স্পটটি সরজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি, সেখানে যেভাবে প্রস্তাবনা ছিল বা যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে কার্যক্রম হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু এটি ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে, পরবর্তীতে কেন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি তা আমার জানা নেই। সেখানে বর্জ্য জমায় পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি এবং পরবর্তীতে যেন প্রকল্পটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় ও পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়, সেজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
একদিকে ১১ কোটি টাকার অকার্যকর অবকাঠামো, অন্যদিকে প্রতিদিন পৌরসভার ৪২ টন বর্জ্যের চাপ—সব মিলিয়ে চরম ক্ষোভ ছড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। এই অচল অবস্থার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখে দ্রুত শোধনাগারটি সচল করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন নেত্রকোণাবাসী।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন