প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৫:২৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
পুঁজিবাজারে নতুন শেয়ার বা আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসছে না অনেক দিন ধরে। আগামী নভেম্বরের আগে নতুন আইপিও আসার সম্ভাবনাও নেই।
আইপিও আইন সংশোধন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই সংশোধিত পদ্ধতির অধীনে কোনো আইপিও সংক্রান্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি।শুধু তাই নয় আগের নিয়মেও কোনো প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে জমা নেই বলে জানা গেছে।
পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের শুরুতেই বিএসইসি আইপিও আইন বা ‘পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’-এ আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই নিয়ম কার্যকর হয়।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে ‘জাঙ্ক’ বা দুর্বল কোম্পানির প্রবেশ রোধ করা।
নতুন নিয়মে কোম্পানিগুলোকে একটি অর্থবছর বা পঞ্জিকা বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, অথবা নিরীক্ষিত ত্রৈমাসিক বা অর্ধ-বার্ষিক বিবরণীসহ আইপিও প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণীসহ প্রস্তাব জমা দিয়ে থাকে। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে প্রাথমিক শেয়ার ইস্যু করার জন্য কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি।
সংশোধিত পাবলিক ইস্যু বিধিমালা অনুসারে, একটি কোম্পানি তার হিসাব বছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে পারবে। এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন না পড়ায় যে কোম্পানিগুলো ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করে তাদের প্রস্তাব জমার সময় এপ্রিলে শেষ হয়েছে।
এক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীসহ আইপিও প্রস্তাব জমা দিতে ইচ্ছুক কোনো কোম্পানির অন্তত ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে বিনিযোগকারীদের নতুন আইপিওর জন্য নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এর আগে আইপিও প্রস্তাব জমা দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের মধ্যবর্তী সময় দীর্ঘ ছিল। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, আইপিও প্রক্রিয়ায় স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যু ম্যানেজার এবং সিকিউরিটিজ কোম্পানিগুলোর নিজ নিজ কাজ সম্পন্ন করার জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে ফিক্সড প্রাইস বা বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে একটি আইপিও প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে সর্বোচ্চ ২০ দিন সময় নেবে। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে একটি আইপিও প্রস্তাব অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ৪০ দিনের মধ্যে এবং বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৫৩ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। সংশোধিত পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে যে, কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে তারা উচ্চতর প্রিমিয়াম দাবি করতে পারবে।
বিএসইসির সংশোধিত বিধিমালায় পূর্বে তালিকাভুক্তিতে যেসব বিষয়গুলো বাধা দিত এবং আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করত, নতুন বিধিমালায় সেগুলোর সমাধান করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় একাধিক আইপিও মূল্যায়ন পদ্ধতিরও অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই এই সংশোধিত পদ্ধতির অধীনে কোনো আইপিও প্রস্তাব জমা দেয়নি।
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বাংলানিউজকে বলেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর কেউ কোনো আইপিওর জন্য আবেদন করেননি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগে ছয়টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল। সেগুলোর মধ্যে রুল কমপ্লায়েন্স না থাকায় পাঁচটি আবেদন বাতিল করা হয়েছে এবং একটি আবেদন আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
কেউ যদি নতুন আইন অনুযায়ী আইপিওর আবেদন করে এবং সব শর্ত পূরণ করে, তাহলে কমিশন অনুমোদন দিতে সময় নিবে না। তবে নতুন কোম্পানি বাজারে আনার ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে ইস্যু কোম্পানি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। একজন রেগুলেটর হিসেবে যতটুকু করা সম্ভব, কমিশন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে সবাইকে নিয়ম মেনেই আসতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে আইপিও সাফল্যের জন্য সেকেন্ডারি মার্কেটের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বর্তমানে বাজারে যে তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বড় কোনো আইপিও আনা হলে তা সফল হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অক্টোবর-নভেম্বর নয় আগে সেকেন্ডারি মার্কেটকে স্থিতিশীল করতে হবে। এরপর আইপিও বাজারে আসুক এমনটাই ভালো হবে বলে মনে করেন তারা।
বাংলানিউজের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে আইপিও কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলেছে। ওই বছর মাত্র ৪টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এগুলো হলো এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংকের শেয়ার অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। বর্তমানে শেয়ারটি ৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় মিডল্যান্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সিকদার ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। ২০২২ সালে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ইন্সুরেন্স, চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স, জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট, ইসলামী কর্মাশিয়াল ইন্স্যুরেন্স এবং নাভানা ফার্মা। এর মধ্যে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। বর্তমানে এই শেয়ারটি ১ টাকা ৭০ পয়সা দরে লেনদেন হচ্ছে।
এমটিবি সিকিউরিটিজ হাউজের অথরাইজ কর্মকর্তা আবুল কাশেম বাংলানিউজকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে আইপিও এলে বরং বাজারে ক্ষতি হবে। কারণ একটা শ্রেণী আইপিওতে নতুন টাকা ঢোকানোর চাইতে সেকেন্ডারি মার্কেটের শেয়ার বিক্রি করে সেই টাকা আইপিওতে এপ্লাই করে। সেক্ষেত্রে সেকেন্ডারি মার্কেটে একটা চাপ তৈরি হয়। সেকেন্ডারি মার্কেটে কিছু আইপিও শিকারি আছে তারা শুধু আইপিও করে এবং আইপিওতে লটারির উপরে সেই শেয়ার বিক্রি করে লাভবান হয়ে মার্কেট থেকে চলে যায়। তারা সেকেন্ডারি মার্কেটে আসে না, আর বর্তমান সময়ে আইপিওর ওপর ভিত্তি করে কোনো হাউস তার ব্যবসা দীর্ঘদিন চালাতে পারবে না।’
একারণে সবাই চায় সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ বাড়ুক। এতে করে ট্রেড বেশি হবে এবং বিনিয়োগকারী উপকৃত হবে। পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের জন্য তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার চেয়ে সময় নিয়ে ভালো কোম্পানি আনা বেশি জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
মন্তব্য করুন