বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:৪৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

টোল কমিয়ে, অবকাঠামো গড়ে কর্ণফুলী টানেলে ট্রাফিক বাড়াতে চায় সরকার

ছবি; সংগৃহিত

কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের সংখ্যা বাড়াতে টোল হার সহনীয় করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ভারী ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে টানেলমুখী করতে টোল পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ। সরকারের আশা, টোল যৌক্তিক পর্যায়ে আনার পাশাপাশি আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেড, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও নতুন সড়ক অবকাঠামোর কাজ এগোলে কর্ণফুলী টানেলে ট্রাফিক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, টানেলের টোলের হার সহনীয় করার চেষ্টা চলছে, যাতে ভারী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে এবং ট্রাফিক মুভমেন্ট বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি আনোয়ারা ও কোরিয়ান ইপিজেডের বিভিন্ন সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে টানেলে যান চলাচল আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পর থেকেই কর্ণফুলী টানেলে প্রত্যাশিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল নিশ্চিত হয়নি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টানেল থেকে প্রতিদিন গড়ে টোল আদায় হচ্ছে ১১ লাখ ২১ হাজার ৭৩০ টাকা। অথচ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৬ টাকা।
উদ্বোধনের সময় প্রতিদিন প্রায় ১৮ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও বাস্তবে সেটি অর্জিত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক বেশি টোলের কারণে ভারী ও বাণিজ্যিক যানবাহনের বড় অংশ এখনো শাহ আমানত সেতু ও কালুরঘাট সেতুর মতো বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। এ ছাড়া টানেলের সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, আলোকসজ্জা, ভেন্টিলেশন, অগ্নিনিরাপত্তা, সিসিটিভি এবং আধুনিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালনায় প্রতিদিন বিপুল ব্যয় হচ্ছে। ফলে প্রকল্পটির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এখনো তৈরি হয়নি।
তবে সরকারের প্রত্যাশা, আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইজেড) চালু হলে পরিস্থিতি বদলাবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) যৌথ উদ্যোগে ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠছে এ শিল্পাঞ্চল। এতে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। গত ২৭ জুলাই শিল্পাঞ্চলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। সরকার আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম শিল্পকারখানার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে চায়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির বড় অংশ উৎপাদনে যাবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক ও কনটেইনারবাহী যানবাহন কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি আধুনিক শিল্প উপশহরে পরিণত হবে। প্রশাসন এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মাস্টারপ্ল্যানে প্রান্তিক জনপদ ও স্যাটেলাইট টাউন
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তাদের নতুন খসড়া ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫–২০৫০)’-এ আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫টি উপজেলাকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করেছে। মূল নগরের ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমাতে এসব সম্ভাবনাময় এলাকায় পরিকল্পিত মিনি শহর ও স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবু ঈসা আনছারী বলেন, একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান কেবল কিছু বিশেষজ্ঞের তৈরি গবেষণাপত্র হতে পারে না। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট, খেলার মাঠ এবং আধুনিক গণপরিবহনের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোকে আমাদের পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে যোগাযোগ চিত্র
শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে রয়েছে বহুমুখী জেটি, আধুনিক সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এবং আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নতুন সড়ক যোগাযোগ।
গত ৯ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারা-দোহাজারী-কক্সবাজার বাইপাস এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া-চকোরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
সওজ চট্টগ্রাম দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, প্রকল্পগুলোর জরিপ ও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে টানেলের আয় প্রত্যাশিত নয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যে শিল্প করিডর গড়ে উঠছে, তা চালু হলে টানেলে ভারী যানবাহনের চলাচল বহুগুণ বাড়বে। এতে টানেলের রাজস্বও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই আগে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, পরে বিনিয়োগ আসে। তাই টানেলের বর্তমান আয় দেখে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা জরুরি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামশুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু টোল কমালেই হবে না। লজিস্টিক ব্যয় কমানো, বাইপাস সড়কগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কর্ণফুলী টানেল তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন