প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ১১:০৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বাইরে মাইকে বাজছে ‘দালালমুক্ত সেবা’র উচ্চকণ্ঠ প্রচার, আর ভেতরে চলছে বিশেষ সংকেত ও কোড নম্বরে ফাইল পাস করানোর গোপন কারবার। নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে এসে প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন শত শত সাধারণ মানুষ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মতো সংবেদনশীল প্রশাসনিক কাজ করানো হচ্ছে ঝাড়ুদার ও নিরাপত্তা প্রহরীদের দিয়ে, যা সরকারি সেবার মানহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাধারণ আবেদনকারীরা সঠিক কাগজপত্র নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও বারবার ফাইল ফেরত পাচ্ছেন। অন্যদিকে দালালদের আনা ফাইলগুলো বিশেষ ই-মেইল ঠিকানা কিংবা ফাইলে লেখা গোপন কোড দেখে মুহূর্তেই অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে।
আবেদনের পাতায় ‘২০২০’, ‘গড়ং’, জ-১১৯’ কিংবা ‘২৫২৬-০০০১৯৮০-জ’-এর মতো হাতে লেখা রহস্যজনক নম্বর ও নির্দিষ্ট কিছু ই-মেইল ডোমেইন ব্যবহার করে ফাইলগুলো আলাদা করা হয়। ইমেইল ডোমেইনগুলো হল- কটঐওঘঙঙজঅকঞঊজ৯০২ঝ@এগঅওখ.ঈঙগ, গউঝঐঅগঝটখঐঅছ৯০২ঝ@এগঅওখ.ঈঙগ, উঊঅগওঘ২০০৬@এগঅওখ.ঈঙগ, গঐঅওঞটঘইওইও.গঞ-১১৫@এগঅওখ.ঈঙগ।
সরেজমিন ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন জমা পড়া সাড়ে চারশ থেকে আটশ আবেদনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি জমা পড়ে এই দালালদের মাধ্যমে। প্রতি ফাইলে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রতিদিন আদায় করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা।
এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুমের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এই ঘুষের টাকার সিংহভাগ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মাদ সাইফুল হাসান, উচ্চমান সহকারী কামরুল হাসান এবং অফিস সহকারী মো. আল মামুন ও মো. সাখাওয়াত হোসেন সরাসরি দালালদের সাথে মোবাইলে ও সশরীরে যোগাযোগ রেখে ফাইলের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। অফিস সময় শেষ হওয়ার পরও বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সিসিটিভি ক্যামেরার নজর এড়িয়ে কিংবা অফিসে বসেই চলে এসব ফাইলের বিশেষ কাজ। অনুসন্ধানে ৩০৫ নম্বর কক্ষে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবর ও ৩য় তলায় নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের কম্পিউটারে বসে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যায়।
পাসপোর্ট অফিসে আসা একাধিক ভুক্তভোগী তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা আকলিমা বেগম বলেন, তিনি নিজে দুইবার লাইনে দাঁড়িয়েও কাগজপত্রের ঘাটতির অজুহাতে ফেরত যান। পরে বাধ্য হয়ে বাইরের একটি কম্পিউটারের দোকানের সহায়তায় অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা দিলে সেই একই কাগজপত্রে দ্রুত সই হয়ে যায়।
মাসদাইরের গার্মেন্টসকর্মী সাগর মিয়া জানান, সকাল সাতটায় এসে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি ফাইল জমা দিতে পারেননি, কারণ কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসেননি। কিন্তু নির্ধারিত কোড দেওয়া ফাইলগুলো অনায়াসে ভেতরে চলে যাচ্ছে। এমনকি ডাব বিক্রেতা নুরুসহ হাদী, রাজিব ও শাহজালালের মতো একাধিক বহিরাগত ব্যক্তি পাসপোর্ট অফিসের চারপাশে প্রকাশ্যে দালালি চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবর জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি কম্পিউটারে বসে ফাইল যাচাইয়ের কাজ করছেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, কার্যালয়কে দালালমুক্ত রাখতে তারা নিয়মিত মাইকিং করছেন। লোকবল সংকটের কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে সাময়িক সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলে স্বীকার করলেও সংকেত ব্যবহার বা ঘুষ লেনদেনের বিষয়টির সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, পাসপোর্ট কার্যালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজ করানো অত্যন্ত দুঃখজনক। দালালি ও কোড ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগটি খতিয়ে দেখে খুব দ্রুত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন