প্রকাশিত: ৫৮ মিনিট আগে, ০৯:২৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম কমতে শুরু করেছে। গত এক সপ্তাহে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে দাম কমলেও বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত তেল চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা কমার প্রভাব দেশের পাইকারি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৩৭০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে একই পরিমাণ তেলের দাম ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে সপ্তাহের ব্যবধানে মণে ১৩০ টাকা কমেছে।
পাম অয়েলের দামও কমেছে। বুধবার প্রতি মণ পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ৬ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ মণে কমেছে ১০০ টাকা। তবে সুপার পাম অয়েলের দাম কিছুটা বেড়েছে। বুধবার প্রতি মণ সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার ৮২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৬ হাজার ৮০০ টাকা।
তবে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল ২০৭ থেকে ২০৮ টাকা, পাম অয়েল ১৭৫ থেকে ১৭৮ টাকা এবং সুপার পাম অয়েল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিঙ্কশিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৫৪ ডলার। জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১ হাজার ২৩৭ ডলারে ওঠে। চলতি বছরের জুনে দাম আরও বেড়ে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৪০ ডলারে পৌঁছায়। এরপর দাম কিছুটা কমেছে। জুলাইয়ে টনপ্রতি গড় দাম ছিল ১ হাজার ৬৫৮ ডলার, আগস্টে ১ হাজার ৬৩৮ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে তা ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারের মধ্যে রয়েছে। ফলে জুনের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও তা প্রায় ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ বেশি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডে মোট ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল এসেছে ৫০ হাজার ৮৯৬ টন, যা মোট আমদানির প্রায় ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ১৫ হাজার ৬১ টন, অর্থাৎ প্রায় ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে সয়াবিন তেলের তুলনায় পাম তেল আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম। ফলে পাইকারি দামের পাশাপাশি খুচরা বাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে। তবে পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেল তুলনামূলকভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
সরবরাহ সংকটের সুযোগে কোনো কোনো এলাকায় বোতলের গায়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরবরাহের ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশিত প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের বর্তমান দাম গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি।
আমদানিকারকদের মতে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি মাসে ভোজ্যতেলের দাম পুনর্র্নিধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিতভাবে তা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে মিল মালিক ও আমদানিকারকরা কয়েক দফায় দেশে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। চলতি বছরে দেশের বাজারে দুই দফায় দাম বাড়ানো হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত হয়নি বলে তাদের দাবি।
গত ২৯ এপ্রিল বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকা থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮০ টাকা করা হয়।
এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর আবারও দাম সমন্বয় করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার ভিত্তিতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
আমদানিকারক আলা উদ্দীন বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে রমজানে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরকারের অনুরোধে তখন দাম সমন্বয় করা হয়নি। রমজানের পর ২৯ এপ্রিল লিটারপ্রতি ৪ টাকা দাম বাড়ানো হয়।
তার মতে পরবর্তী সময়ে দ্রুত মূল্য সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা হয়নি। এরপর তিন মাসে সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১৭ টাকা পর্যন্ত উঠলেও বিক্রয়মূল্য ছিল ১৯৯ টাকা। এতে লিটারপ্রতি প্রায় ১৮ টাকা লোকসান হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়ানো হলেও এখনো প্রতি লিটারে ১০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাম অয়েলের দাম মণে ১০০ টাকা কমেছে। সয়াবিন তেলের দামও একইভাবে কমেছে। তবে এর আগে দুই ধরনের তেলের দাম অনেকটাই বেড়েছিল।
তিনি বলেন, সামনে শীত মৌসুম। এ কারণে এ সময়ে পাম অয়েলের দাম কিছুটা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়লেও এর প্রভাব এখনো ভোজ্যতেলের বাজারে পড়েনি।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন