ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

টিআইবি বাস্তব সংস্কার কার্যক্রম দেখছে না, প্রক্রিয়াগত অগ্রগতি উপেক্ষিত : অর্থ উপদেষ্টা 

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০২৬, ১০:০৬ রাত  

ছবি: সংগৃহিত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তব সংস্কার কার্যক্রম দেখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, টিআইবি মূলত আইন ও নীতিমালার দিকেই বেশি নজর দেয়, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়াগত সংস্কার ও সহজীকরণ হয়েছে, সেগুলো তারা দেখছে না বা দেখতে পারছে না।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “টিআইবির লোকজন চোখে সবকিছু দেখতে পারে না। ওদের তো দিব্যদৃষ্টি নেই, ভালো দৃষ্টিও নেই। দেখতে চাইলেও অনেক কিছু তারা দেখতে পারে না।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার যে বাস্তবভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তার অনেকটাই টিআইবির মূল্যায়নে অনুপস্থিত।

সাংবাদিকরা উল্লেখ করেন, আগের দিন টিআইবি দাবি করেছে,সরকার যতটা দৃশ্যমান সংস্কারের কথা বলছে, বাস্তবে উন্নয়ন বা সংস্কার ততটা হয়নি। এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, টিআইবি কেবল আইনগত কাঠামোর দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ সরকার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগে বিদেশি মজুরি প্রকল্পে অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা ছিল, এখন সেটি অনেক সহজ করা হয়েছে। “সব কিছু পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় না হলেও আগের চেয়ে অনেকটাই সহজ হয়েছে। এগুলো তারা কেন দেখছে না, এই প্রশ্ন থেকেই যায়,” বলেন তিনি।

এক সাংবাদিক স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে সালেহউদ্দিন আহমেদ টিআইবির প্রশংসা করতেন, কিন্তু ক্ষমতায় এলে অনেকেই টিআইবিকে সমালোচনার চোখে দেখেন। এর জবাবে তিনি বলেন, তিনি এখনো টিআইবির বদনাম করছেন না। তবে মৌলিক ও বাস্তব বিষয়গুলোর দিকে তাদের নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। “কেউ যদি না দেখার ইচ্ছা করে, তাহলে অনেক কিছুই উপেক্ষা করা যায়,” যোগ করেন তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন, এ প্রসঙ্গ টেনে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মানুষের প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক। সরকারও ধাপে ধাপে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা জরুরি। তিনি বলেন, ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রক্রিয়ায় এত গলদ রয়েছে, যা বাইরে থেকে কল্পনাও করা কঠিন। তবুও অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনেক কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। অর্থ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে অন্য অনেক উপদেষ্টার মধ্যেও হতাশা কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি সিভিল সার্ভিস থেকে আসা একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি। কীভাবে প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে নিতে হয়, তা তিনি জানেন। কিন্তু সবার সে অভিজ্ঞতা নেই। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজ করা অত্যন্ত কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে প্রক্রিয়াগুলো জটিল, নানা ধরনের হস্তক্ষেপ রয়েছে, যা অনেক সময় জট ছাড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। এটি কি আমলাতান্ত্রিক সমস্যা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই আমলাতান্ত্রিক সমস্যার একটি বড় অংশ রয়েছে। পাশাপাশি যারা আইন তৈরি করেছে, তারাও অনেক ক্ষেত্রে আইন যথাযথভাবে করেনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একসময় ব্যাংকে এক পরিবার থেকে দুই বা তিনজন পরিচালক থাকার নিয়ম ছিল, পরে সেটি বাড়িয়ে ছয়জন করা হয়েছে, যা সংস্কারের বদলে পেছনের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

দেড় বছর দায়িত্ব পালন শেষে দেশের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তার মতে অর্থনীতি বর্তমানে একটি সন্তোষজনক ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যৎ সরকারকে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এই সরকার সর্বোচ্চ ঋণ নিয়েছে, এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ঋণ যেমন নেওয়া হয়েছে, তেমনি সর্বোচ্চ ঋণ শোধও করা হয়েছে। ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দায় পরিশোধের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের হলেও এর সুফল ভোগ করবে ভবিষ্যৎ সরকার।

উন্নয়ন আগের মতো হয়নি, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজ থেমে গেছে, কারণ আগের মতো অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হয়নি। উদাহরণ হিসেবে কর্ণফুলী টানেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে এত ঋণ নিতে হলো কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের সময়ের দায়বদ্ধতা বাতিল না করায় সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে।

বেকারত্ব বাড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সে জন্য পর্যাপ্ত অর্থের জোগান ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করেছে, তবে বড় শিল্পকারখানায় শ্রমনির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম এ মন্তব্যও করেন তিনি।

সবশেষে ‘অর্থনীতি সন্তোষজনক’ মন্তব্যের ব্যাখ্যায় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সন্তোষজনক বলতে তিনি স্থিতিশীল অবস্থার কথা বোঝাচ্ছেন। অর্থনীতি এখন আগের মতো নড়বড়ে নয়, ভবিষ্যৎ সরকার এটিকে আরও এগিয়ে নিতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাধারা/এসআর