ঈদকে ঘিরে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন, শক্তিশালী হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার
প্রকাশিত: মার্চ ২০, ২০২৬, ০৪:৫৪ দুপুর
ছবি: সংগৃহিত
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থপ্রবাহে জোয়ার এসেছে। পরিবারের বাড়তি ব্যয় মেটাতে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠানোর ফলে চলতি মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশে এসেছে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। এতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের মার্চে মোট রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, আর বিপিএম-৬ হিসাবে ছিল ২০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ থাকে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে থাকে, যেখানে আইএমএফের এসডিআর, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং আকুর বিলের মতো কিছু খাত বাদ দেওয়া হয়। যদিও এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। মাসে গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরলে, এ রিজার্ভ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকাকে নিরাপদ ধরা হয়, সে বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।
অবশ্য এই অবস্থানে পৌঁছাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। একসময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তখন বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ডলার বিক্রি কমিয়ে দেন। পাশাপাশি হুন্ডি ও অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে ডলার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে রিজার্ভ। তবে আগের দায় পরিশোধের চাপ থাকায় বর্তমানে এটি ৩৩ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রবাসী আয় বাড়ায় বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বেড়েছে। বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে, ফলে রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেই বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রিজার্ভ একসময় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল ২০২১ সালের আগস্টে, যখন তা ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সে সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ২০ পয়সা। পরবর্তী সময়ে ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচারসহ নানা কারণে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে (আইএমএফ পদ্ধতিতে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন)। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়ে ডলারের দাম ১২০ টাকার ওপরে উঠে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করা হয় এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে।
চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে ২২০ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি এবং তার আগের মাস ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
এই প্রবাহের সুযোগ নিয়ে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।
তবে সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এখনো বড় বিনিয়োগ না বাড়ায় আমদানির চাপ তুলনামূলক কম ছিল, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ বাড়লে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে, ফলে ডলারের চাহিদাও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারলে ভবিষ্যতে ডলার সংকট বড় আকার ধারণ করবে না। বরং প্রবাসী আয় ও রপ্তানির দ্বিমুখী প্রবাহ ধরে রাখতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার আরও স্থিতিশীল হবে।
বাংলাধারা/এসআর
