বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৯ ঘন্টা আগে, ০২:৪০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

যমুনার গর্ভে ষষ্ঠবার হারাল ১০৭ বছরের স্কুল

বাঁধের ওপর টিনের ছাউনিতে চলছে পাঠদান

ছবি: সংগৃহিত

যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে আবারও হারিয়ে গেছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১০৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত ১৬ মে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া বিদ্যালয়টি এর আগেও পাঁচবার ভাঙনের শিকার হয়েছিল। এবার ষষ্ঠবারের মতো ভবন হারানোর পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ না করতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ী টিনের ছাউনি নির্মাণ করে সেখানে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে পাঠদান।

খোলা আকাশের নিচে, চারদিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম। বৃষ্টি নামলেই টিনের চালা দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে বই-খাতার ওপর। দমকা বাতাসে কেঁপে ওঠে অস্থায়ী কাঠামো। তবুও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে না। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছেন।

১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় ছিল এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একসময় বিদ্যালয়টিতে ৪৮২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে গ্রাম ও বসতি বিলীন হওয়ায় অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। ফলে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭৪ জনে।

বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ছয়জন শিক্ষক থাকলেও দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে চারজন শিক্ষক অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষেই নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে যাওয়া মানেই প্রতিদিন এক কঠিন লড়াই। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপু বাবু প্রতিদিন সুজাতপুর চর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে নদীর ঘাটে আসে। এরপর খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে আরও প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে পৌঁছাতে হয় বিদ্যালয়ে।

দিপু বাবুর ভাষায়, "আমাদের স্কুলটা যদি নিরাপদ জায়গায় থাকত, তাহলে আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারতাম। খেলাধুলারও সুযোগ থাকত।"

একই চিত্র পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়ার জীবনেও। প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে আসতে হয় তাকে। খেয়া নৌকা বন্ধ থাকলে কিংবা আবহাওয়া প্রতিকূল হলে অনেক সময় স্কুলে পৌঁছানোই সম্ভব হয় না।

বিদ্যালয় ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা যেন বন্ধ না হয়, সেই চিন্তা থেকেই নিজেদের অর্থ ব্যয় করে বাঁধের ওপর অস্থায়ী টিনের ছাউনি নির্মাণ করেছেন শিক্ষকরা। সেই অস্থায়ী আশ্রয়েই চলছে প্রতিদিনের পাঠদান।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, গত প্রায় এক দশকে তাঁর চোখের সামনেই বিদ্যালয়টি পাঁচবার নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। এবার ষষ্ঠবারের মতো একই ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তরের জন্য মাটি ভরাট ও নতুন ভবন নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তরের জন্য প্রায় ৮০ লাখ টাকার প্রয়োজন।

সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়তে থাকে। তখন শিক্ষার্থীদের পাশের কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। বৃষ্টি থেমে গেলে আবার ক্লাস শুরু করা হয়।

চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই একমাত্র নয়, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার যমুনা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙনের কারণে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কামালপুর, হাটশেরপুর, শিমুলতাইড়, হাসনাপাড়া, ইছামারা, দড়িপাড়া ও কর্নিবাড়িসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করমজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।

ইতোমধ্যে নয়াপাড়া, চকরতিনাথ এবং দক্ষিণ হাটবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বিকল্প স্থানে অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

হাটশেরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বকুল মিয়া জানান, গত কয়েক বছরে নদীভাঙনের কারণে চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি ও শিমুলবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, উপজেলার চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয় ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং সেটি স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি ভাঙন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর বর্তমানে ভাঙনের কবলে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

যমুনার অব্যাহত ভাঙনে শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে জনপদ, বসতি, শিক্ষার পরিবেশ এবং মানুষের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তবুও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিনের ছাউনির নিচে প্রতিদিন নতুন দিনের আশায় বই খুলে বসছে ছোট্ট শিক্ষার্থীরা- যা সংকটের মধ্যেও শিক্ষার প্রতি অদম্য প্রত্যয়ের এক অনন্য উদাহরণ।


বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন