বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৭ ঘন্টা আগে, ০২:৪১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা

ছবি: সংগৃহিত

বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া-দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সেটি আবার খুলবে কি না, সেই প্রশ্নকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আসন্ন উচ্চপর্যায়ের সফর। আগামী ২১ থেকে ২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি তার সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর হওয়ায় কূটনৈতিকভাবে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি বাস্তবিক অর্থেও সফরটি বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষ করে, এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার ইস্যু।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম-এর আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ২২ জুন দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এসব চুক্তির পাশাপাশি শ্রমবাজার ইস্যুতেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ রয়েছে। ওই সময় দেশটির সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদিত কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দিয়ে পরবর্তীতে নতুন করে কর্মী নেওয়া স্থগিত করে। ফলে হাজার হাজার সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখনো শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈঠকে শুধু শ্রমবাজার খোলার বিষয়ই নয়, বরং ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, কনস্যুলার সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অনথিভুক্ত কর্মীদের সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে একটি স্বচ্ছ ও টেকসই নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।

শুধু জনশক্তি রপ্তানি নয়, সফরে দুই দেশের মধ্যে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর খাতে সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব, কৃষি, হালাল খাদ্য শিল্প এবং সুনীল অর্থনীতি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মতো বিষয়েও মতবিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদিও সফরটি সময়ের হিসেবে সংক্ষিপ্ত, তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়াকে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীন সফরে যাবেন, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু শঙ্কাও রয়েছে। অতীতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি, অতিরিক্ত খরচ এবং স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন না হলে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। বিশেষ করে, রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার একতরফা নিয়ন্ত্রণ থাকলে সিন্ডিকেটের প্রভাব আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

এরই মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বড় আকারের অফিস অবকাঠামো। বাংলাদেশ এসব শর্তের কিছু শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছে এবং ইতোমধ্যে শতাধিক এজেন্সির তালিকাও পাঠিয়েছে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর একটি বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির কাঠামো কতটা স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং অতীতের সমস্যাগুলো থেকে কতটা কার্যকরভাবে উত্তরণ সম্ভব হয় তার ওপর। এখন দেখার বিষয়, এই সফর বাংলাদেশি কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য সত্যিই নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে কি না।

মন্তব্য করুন