বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২৩ ঘন্টা আগে, ০৩:০০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

নিরাপত্তাহীনতা থাকলে চিকিৎসকদের বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে না: প্রধানমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

দেশে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন ও সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে জনগণের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

একই সঙ্গে চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চিকিৎসকেরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের বিশ্বাস ও মর্যাদার সম্পর্ক না থাকে, তাহলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই করা হোক, চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশমুখিতা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

শনিবার (১৫ আগস্ট) ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার চাহিদা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার ফলে হাসপাতালটি এখন আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

এ জন্য হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, হেলথ টেকনিশিয়ানসহ সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।

নিউরোচিকিৎসায় বাড়বে সক্ষমতা

স্নায়ুবিক বা নিউরোলজিক্যাল রোগকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্ট্রোক, এপিলেপসি, পারকিনসন্স ডিজিজ, ডিমেনশিয়া, মেরুদণ্ডের জটিলতাসহ বিভিন্ন নিউরোলজিক্যাল রোগে দেশে আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

৫০০ শয্যার নতুন ভবন চালুর ফলে এসব রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ড নিয়ে গড়ে ওঠা ভবনটি শুধু রোগী ভর্তির সক্ষমতাই বাড়াবে না, চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে তুলনামূলক কম খরচে বিশ্বমানের নিউরোচিকিৎসা পেতে পারে, সেই লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বাড়তি শয্যা ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অবকাঠামো দেশের অসংখ্য রোগীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতাও জরুরি

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির গুরুত্বের পাশাপাশি চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে না; এর সঙ্গে মানবিকতার সমন্বয় অপরিহার্য।

প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু একজন রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার মানসিক অবস্থা বোঝা এবং সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল আচরণ চিকিৎসাসেবার মান আরও বাড়িয়ে দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে হাসপাতালের পরিবেশ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকদের নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন—এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা যদি কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, আবার রোগী ও স্বজনেরা চিকিৎসকদের প্রতি বিশ্বাস ও মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে শুধু হাসপাতালের ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা শয্যা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশমুখিতাও বন্ধ করা কঠিন হবে।

স্বাস্থ্যসেবা হতে হবে সবার জন্য

স্বাস্থ্যকে শুধু মৌলিক অধিকার নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসাসেবা যদি কেবল রাজধানী বা শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তাকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলা যাবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের যেন ছোটখাটো চিকিৎসার জন্যও বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে ছুটতে না হয়, সে জন্য ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

এর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অক্টোবরে চালু হচ্ছে পাঁচ বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুস্থ ও সক্ষম আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা আরও বিস্তৃত করতে খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসে একযোগে এসব পাঁচটি হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য সরকারের কাছে শুধু একটি স্লোগান নয়। দেশের ভেতরেই মানুষ যাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পেতে পারে, সে লক্ষ্যেই কার্যকর ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

তবে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন কিংবা বাজেট বরাদ্দ—কোনোটিই একা স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানবসম্পদ, উন্নত ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, সুশাসন এবং রোগীবান্ধব চিকিৎসাসেবার সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

‘অর্থাভাবে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না’

এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে চিকিৎসার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না।

তিনি বলেন, একজন সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের অধিকার, প্রত্যাশা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা এবং এমন একটি নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি—যেখানে চিকিৎসক নিশ্চিন্তে সেবা দিতে পারবেন এবং রোগীও দেশের ভেতরেই আস্থার সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারবেন।

বাংলাধারা/শারমিন

 

মন্তব্য করুন