প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ১১:২০ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে স্বপ্ন এতদিন অধরাই ছিল, ডারউইনে সেটিই বাস্তবে রূপ নিল। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই ঘরের মাঠে দাপটের সঙ্গে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল টাইগাররা। একই সঙ্গে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে এমন জয় শুধু একটি ম্যাচের সাফল্য নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্বমানের পেস আক্রমণ নিয়ে মাঠে নামা অস্ট্রেলিয়াকে চার দিন ধরে যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বাংলাদেশ, তা নিঃসন্দেহে দেশের ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন হয়ে থাকবে।
২৩ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে ডারউইন ও কেয়ার্নসে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে প্রত্যাশা ছিল লড়াই করার। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই টাইগাররা বুঝিয়ে দেয়, এবার গল্পটা অন্য রকম হতে যাচ্ছে।
১৩ আগস্ট ম্যাচের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে যে ধস নামান, সেখান থেকেই ঐতিহাসিক জয়ের ভিত্তি তৈরি হয়। দুই সেশন পেরোনোর আগেই অস্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং শক্তির দিকে তাকালে এমন পারফরম্যান্স ছিল প্রায় অকল্পনীয়।
অস্ট্রেলিয়ার জবাব দেওয়ার পালায়ও ছিল বাংলাদেশের দাপট। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বসেরা পেসারদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ যে বাংলাদেশকে চাপে ফেলবে, সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু সেই চাপ সামলে উল্টো ব্যাট হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বাংলাদেশ।
তানজিদ হাসান তামিম তুলে নেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। তার সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতক বাংলাদেশের ইনিংসকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়। টেলএন্ডারদের কার্যকর অবদানও ছিল প্রশংসনীয়। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের জবাবে ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয় বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে এত বড় লিড আগে কখনো নিতে পারেনি টাইগাররা।
এই লিডই অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে চাপে ফেলে দেয়। বড় ঘাটতি পুষিয়ে নিতে নেমে শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলারদের সামনে অস্বস্তিতে ছিল স্বাগতিকরা। হাসান আবারও জোড়া আঘাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ভিত নাড়িয়ে দেন। প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও তা বাংলাদেশের জয় ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
বিশেষ করে মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা বারবার সমস্যায় পড়েন। গ্রিনের সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও মিরাজের ঘূর্ণিতে সেই প্রতিরোধ বেশিদূর এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার লিড এমন জায়গায় থেমে যায়, যেখানে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ৫৭ রান।
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অবশ্য শুরুটা স্বস্তিদায়ক ছিল না বাংলাদেশের। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান তামিম এবার কোনো রান না করেই ফিরেছেন। তবে তাতে বাংলাদেশের জয়ের পথে বড় কোনো বাধা তৈরি হয়নি। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক ঠান্ডা মাথায় বাকি কাজ শেষ করেন। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্মরণীয় এক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
এই জয়ের মাহাত্ম্য আরও বেড়ে যায় প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করলে। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে ছিলেন মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের মতো অভিজ্ঞ পেসাররা। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে টাইগারদের মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে দেওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার আত্মবিশ্বাসও ছিল তুঙ্গে। কিন্তু মূল লড়াইয়ে সেই প্রস্তুতি ম্যাচের কোনো প্রভাবই রাখতে পারেনি স্বাগতিকরা।
বরং ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাংলাদেশ দেখিয়েছে মানসিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা এবং আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের পরিচয়। পেসাররা শুরুতে পথ দেখিয়েছেন, ব্যাটাররা বড় লিড এনে দিয়েছেন এবং স্পিনাররা অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে শেষ আঘাতগুলো করেছেন। দলীয় পারফরম্যান্সের এমন সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়েছে ঐতিহাসিক জয়।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্ট জয়ের জন্য বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল দীর্ঘ ২৩ বছরের। সেই অপেক্ষার অবসানও হলো এমন এক ম্যাচে, যেখানে শুধু জয় নয়, পুরো ম্যাচজুড়েই আধিপত্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ফলে এই জয়কে কেবল পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসেরও বড় ঘোষণা।
সিরিজে এখন বাংলাদেশ এগিয়ে ১-০ ব্যবধানে। ফলে বাকি ম্যাচে কী হয়, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডারউইনে যে ইতিহাস লেখা হয়ে গেল, সেটি আর মুছে যাওয়ার নয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকেই গুঁড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিল টেস্ট ক্রিকেটে বড় দলের বিপক্ষে লড়াই করার সামর্থ্য শুধু স্বপ্ন নয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ দেওয়া সম্ভব।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন