প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ১১:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ফেনীতে অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহের শেষ বিদায়েও মিলছে না প্রাপ্য মর্যাদা। ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে এসব মরদেহ অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ির পরিবর্তে পৌরসভার ময়লাবাহী গাড়িতে করে নেওয়া হচ্ছে কবরস্থানে। শুধু তাই নয়, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল ও জানাজার নামাজ ছাড়াই অনেক মরদেহ দাফন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শহরের সুলতানপুরে অবস্থিত ফেনী পৌর কবরস্থানে অজ্ঞাত মরদেহ দাফনের এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, বেওয়ারিশ হলেও এসব মরদেহ কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান, স্বজন কিংবা আপনজন। তাই শেষ বিদায়ের সময় তাদের প্রতি ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে অজ্ঞাত মরদেহগুলো দাফনের জন্য ফেনী পৌর কবরস্থানে নেওয়া হয়। তবে এসব মরদেহ পরিবহনের জন্য পৌরসভার আলাদা কোনো গাড়ি না থাকায় ময়লাবাহী ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছে।কবরস্থানে নেওয়ার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মরদেহকে ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী গোসল করানো কিংবা জানাজার নামাজ পড়ানো হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থান সংকুলানের অজুহাতে মাত্র ৫ থেকে ৬ মাসের ব্যবধানে একই কবরে একাধিক মরদেহ দাফনের ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী এই কবরস্থানটিতে মরদেহের গোসল ও দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও নেই। গোসলের পানি তোলার জন্য কোনো মোটর না থাকায় পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হয়। গ্রীষ্মকালে পুকুর শুকিয়ে গেলে তৈরি হয় আরও বড় সংকট।
কবরস্থানজুড়ে নেই সীমানাপ্রাচীর ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। দিনের বেলায় গরু-ছাগল অবাধে বিচরণ করে। আর সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে এলে পুরো এলাকা মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে ‘মুসলিম কবরগাহ’ নামে কবরস্থানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথের দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ফেনীতে নিহত বেওয়ারিশ মরদেহের প্রধান ঠিকানা এই কবরস্থান।
২০০৫ সালে তৎকালীন পৌর মেয়র নুরুল আবছারের উদ্যোগে ‘বিটুপিকা’ নামের একটি সবুজায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তখন পুকুরের দৃষ্টিনন্দন ঘাট ও দর্শনার্থীদের বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে সেগুলো ধ্বংসপ্রায় ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ফলে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে কিংবা জিয়ারত করতে আসা মানুষজনও সেখানে প্রয়োজনীয় পরিবেশ পাচ্ছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘বেওয়ারিশ হলেও এই মানুষগুলো কারও না কারও সন্তান বা স্বজন। তাই অজ্ঞাত মরদেহ পরিবহনে ময়লার গাড়ির ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তাঁদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ির ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে দাফনের আগে গোসল ও জানাজার মতো ধর্মীয় ও মানবিক আনুষ্ঠানিকতাও নিশ্চিত করা জরুরি।’
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পৌরসভা যদি একার পক্ষে না পারে, তাহলে সরকারি-বেসরকারি আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। তবুও এই কাজের একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা হওয়া দরকার।’
স্থানীয় যুবক জামাল হোসেন বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই পৌর কবরস্থান এলাকাটি মাদক ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যায়। পাশের পরিত্যক্ত সার কারখানায় বসেই তারা মাদক সেবন করে। প্রশাসনকেও এ বিষয়ে নির্বিকার দেখা যায়।’
কবরস্থানের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ফেনী পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানায়, সীমিত সামর্থ্য ও বাজেটের মধ্যেই তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, প্রতি বছর এখানে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ দাফন করা হয়। তবে ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক এই কবরস্থানের অবকাঠামো ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নে বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ কাজের দায়িত্বে থাকা পৌরসভার আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কৃষ্ণপদ সাহা বলেন, ‘অজ্ঞাত মৃতদেহ বহনের জন্য আমাদের কোনো গাড়ি আলাদা নেই। তাই যেটি আছে, সেটি দিয়েই কাজ করা হচ্ছে।’
গোরস্থানের সীমানাপ্রাচীর ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৌরসভার পরিকল্পনা রয়েছে। গোরস্থানটির উন্নয়নে পরিকল্পনা হাতে আছে। মৃতদেহ পরিবহনের জন্য আলাদা গাড়ির জন্যও চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও ফেনী পৌরসভার প্রশাসক মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘মুসলিম রীতি অনুযায়ী গোসল, জানাজা ছাড়া লাশ দাফনের বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করেছে। আমি বিষয়টি পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিটিং করে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে এমনটি আর না করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ময়লার গাড়ির পরিবর্তে একটি অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ি দেওয়ার বিষয়ে আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ হলে গাড়ির সমস্যা দূর হবে বলে আশা করছি।’
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন