বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১১ ঘন্টা আগে, ১২:৫০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

হাইকোর্টের রায় বহাল, সংবিধানে ফিরছে গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে পুনরায় গণভোটের বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে সর্বোচ্চ আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।

রায় ঘোষণার পর আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির একে ‘ঐতিহাসিক রায়’ হিসেবে অভিহিত করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এর আগে টানা তিন দিনের শুনানি শেষে বুধবার (৮ জুলাই) আপিল বিভাগ রায় ঘোষণার জন্য ৯ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছিলেন। বহুল আলোচিত এই মামলায় পঞ্চদশ সংশোধনীর বিভিন্ন বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিস্তৃত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

মামলার সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত।

হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেন, গণতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই এ গণতন্ত্র বিকশিত হয়। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি এবং জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে এ ব্যবস্থার বিলুপ্তি সংবিধানের মৌলিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। পাশাপাশি সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল না করে আদালত বাকি বিধানগুলো বহাল রাখেন এবং ভবিষ্যতে সংসদকে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো সংশোধন বা পরিমার্জনের সুযোগ রেখে দেন।

গণভোটের প্রসঙ্গে আদালত বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিদ্যমান গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারার মাধ্যমে। আদালতের মতে, এ বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। এছাড়া সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।

পরবর্তীতে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি মামলায় পক্ষভুক্ত হন।

সর্বশেষ আপিল বিভাগের এ রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন