ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

২০২৫ সালে সড়কে ঝরেছে ৯ হাজারের বেশি প্রাণ, বেড়েছে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ০৪, ২০২৬, ০১:৪০ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন মানুষ। আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ৮১২ জন। সারা বছরে সংঘটিত ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

রোববার (৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এসব তথ্য তুলে ধরেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, বিদায়ী বছরে শুধু সড়কেই নয়- রেল ও নৌ-পথেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলপথে সংঘটিত ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ১২৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৮ জন, আহত হয়েছেন ১৩৯ জন এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৩৮ জন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ২১৯ জন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১৪.৯৮ শতাংশ।

সড়ক, রেল ও নৌ-পথ মিলিয়ে গত বছর দেশে মোট ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৬ জন আহত হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ১৪.৮৭ শতাংশ।

দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৩৮.২২ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.১৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২৮.৮৩ শতাংশ ফিডার রোডে। এছাড়া ঢাকা মহানগরীতে ৪.২২ শতাংশ, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ০.৯০ শতাংশ এবং রেলক্রসিংয়ে ০.৬৮ শতাংশ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন না আসায় দুর্ঘটনা ও মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। যানজট ও চাঁদাবাজির কারণে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ভাড়া বেড়েই চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সড়ক পরিবহনখাত সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ পরিবহন মালিকদের ইচ্ছাধীন ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছে।

তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর দেশের আর্থিক ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই ভয়াবহ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা ও উন্নত গণপরিবহনের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহনখাত সংস্কারে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হলো-

* রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবহনখাত সংস্কার, সড়ক নিরাপত্তা ও যাত্রী অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা
* সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে আলাদা সড়ক নিরাপত্তা উইং চালু
* দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারি তহবিল কার্যকর করা
* সরকার নির্ধারিত ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ
* পরিবহন সেক্টরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ
* আধুনিক কারিকুলামের মাধ্যমে গাড়ির ফিটনেস, নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রদান
* নগর এলাকায় আধুনিক ইলেকট্রিক এসি বাসের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা
* প্রযুক্তিনির্ভর, দুর্নীতিমুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রবর্তন
* জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেন এবং বৈধ-অবৈধ যানবাহনের জন্য পৃথক লেন চালু
* গণপরিবহন সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তে যাত্রী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীতিগত সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দেশের সড়কে এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হবে।

 

বাংলাধারা/এসআর