ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জামায়াতের নির্বাচনী সমঝোতায় নেই ইসলামী আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৮, ২০২৬, ১১:১১ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’ শেষ মুহূর্তে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থি রাজনীতিতে যে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ বা এক বাক্সে ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের ছেদ পড়ল। বদলে গেল ভোটের সমীকরণ। জোটের বাকি দলগুলোকে এখন নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে।

দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির পরও ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত জোটে যোগ না দিয়ে ২৬৮টি আসনে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত রাজনীতির মাঠে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ইসলামপন্থি ঐক্যে এই ফাটল কেন? আর এর লাভ কার, ক্ষতি কার?

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই অনৈক্য সবচেয়ে বেশি সুবিধা এনে দিতে পারে বিএনপির জন্য। যদিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, ইসলামী আন্দোলন বাইরে থাকলেও ভোটের অঙ্কে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম মনে করেন, ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্তটি নির্বাচনী রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। তার ভাষায়, এটি আদর্শিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শিবিরে একটি স্পষ্ট বিভাজনের ইঙ্গিত বহন করে।

তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন এখন নিজেদের আর ছোট দল মনে করছে না। সাম্প্রতিক স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে তারা নিজেদের তৃতীয় শক্তি বা সম্ভাব্য ‘কিংমেকার’ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও প্রতীক হাতপাখা কিছুটা হলেও আড়ালে পড়ে যেতে পারে। এককভাবে ২৬৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ বেশি থাকবে- এমন হিসাব থেকেই তারা এই পথে হেঁটেছে।

ভোটের মাঠে ইসলামপন্থিদের এই বিভাজনের সরাসরি সুফল বিএনপি পেতে পারে বলেও মনে করেন অধ্যাপক শামছুল আলম। তার মতে, দেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোট ধর্মভিত্তিক বা ডানপন্থি দলগুলোর দিকে ঝোঁকে। এই ভোট যদি আলাদা আলাদা ভাগে পড়ে, তাহলে ইসলামপন্থি দলগুলোর এককভাবে আসন জয়ের সম্ভাবনা কমে যাবে। এতে তুলনামূলক কম ভোটেও বিএনপির জয় সহজ হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই নির্বাচনী ঐক্য রাজনীতির আলোচনায় ছিল শীর্ষে। গত সেপ্টেম্বর থেকে অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নামে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি দল। পরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি যুক্ত হলে জোটের আকার দাঁড়ায় ১১ দলে। তবে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলন জোটে না থাকার ঘোষণা দিলে এখন তা নেমে আসে ১০ দলে।

জোটসংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, ইসলামী আন্দোলন না থাকলেও তারা ২৫৩টি আসনে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। তবে চরমোনাই পীরের দলের বড় কর্মীভিত্তি ও ভোটব্যাংক বাইরে থাকায় মাঠপর্যায়ের প্রভাব কতটা ধরে রাখা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

জোটের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানোর পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করেছে- আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব। শুরুতে দলটি ১০০ থেকে ১২০টি আসনে নির্বাচন করতে চাইলেও পরে অন্তত ৫০টি আসনের দাবি তোলে। কিন্তু জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি হয়নি। ‘উন্মুক্ত’ আসন নিয়েও সমঝোতা হয়নি। পাশাপাশি জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করা হবে না- এমন বক্তব্যকে আদর্শিকভাবে মেনে নিতে পারেনি ইসলামী আন্দোলন। দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, জামায়াত কৌশলগত কারণে আল্লাহর আইন থেকে সরে এসেছে- এমনটাই তারা মনে করে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে পড়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত হাতছাড়া হলো। ইসলামী আন্দোলন আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ায় বহু আসনে বিএনপি, জামায়াত জোট ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বিভাজন বিএনপির জন্য পথ আরও মসৃণ করতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইসলামী আন্দোলন না থাকায় ফাঁকা থাকা ৪৭টি আসন জোটের ভেতর সমঝোতার ভিত্তিতেই বণ্টন হবে। তবে এই মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আর সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। তার মতে, একসঙ্গে নির্বাচন করতে না পারা সব পক্ষেরই ব্যর্থতা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব যুবায়ের জানান, ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্ত মূল্যায়ন করে শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে জামায়াত। তিনি বলেন, তাদের জন্য আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল, এখনো সময় আছে। ফাঁকা আসনগুলোর বিষয়ে লিয়াজোঁ কমিটি আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সব মিলিয়ে, শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানো ইসলামপন্থি রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই অনৈক্য শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিন এবং জনমতের রায়ে।


বাংলাধারা/এসআর