৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী- ইতিহাসে নতুন বাঁক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৬:২৮ বিকাল
ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২২১টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোট, ফলে দলটির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নেতৃত্বে আসতে যাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যা বাস্তবায়িত হলে প্রায় তিন দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশ আবার একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাবে- এমন একটি ঘটনা যা ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার রাতভর গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন। নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টিতে। ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি নেতৃত্বের ধারায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০- এর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের শাসনভার ছিল নারী নেতৃত্বের হাতে। সেই সময়ের অধিকাংশ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। ফলে টানা প্রায় ৩৫ বছর পর আবার পুরুষ নেতৃত্বে সরকার আসার সম্ভাবনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ বাঁক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনে জয়ের পর বিজয়োৎসব নিয়ে বিএনপি নিয়েছে ভিন্নধর্মী অবস্থান। দলীয়ভাবে নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলের প্রেস উইং জানিয়েছে, নিরঙ্কুশ জয়ের জন্য সারা দেশে বাদজুমা শুকরিয়া আদায় ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হবে এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়েও প্রার্থনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযত উদযাপন নতুন সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা- ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল ভাবমূর্তি তুলে ধরার কৌশল।
ভোটের দিন সকাল সাড়ে সাতটায় দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত চলে। এরপর শুরু হয় গণনা। শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকায় এবার ভোট হয়েছে ২৯৯টি আসনে। মোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী, যার মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র ২৭৪ জন এবং নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন- যাদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি, নারী প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজারের বেশি। প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মাত্রা যুক্ত করেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে সরকার গঠনের পথ সুগম হলেও নতুন প্রশাসনের সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সমন্বয় এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু নতুন সরকার নয়, বরং নেতৃত্বের ধারা, নীতিনির্ধারণের অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
বাংলাধারা/এসআর
