একমাত্র সন্তানের লাশও ফেরেনি, সাগরেই থেমে গেল ফাহিমের স্বপ্নযাত্রা
প্রকাশিত: এপ্রিল ০১, ২০২৬, ০১:৩৯ দুপুর
ছবি: সংগৃহিত
স্বপ্ন ছিল পরিবারের হাল ধরা, বাস্তবতা হলো নিঃশেষ এক ট্র্যাজেডি। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের ১৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবু ফাহিম, যে ছেলেটি একসময় স্বচ্ছল জীবনে অভ্যস্ত ছিল, সেই তিনিই জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রবাসে। কিন্তু ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না; লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে উত্তাল সাগরই কেড়ে নিল তার জীবন।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ফাহিমই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। দীর্ঘ ছয়দিন সাগরে ভেসে থাকা একটি নৌকায় খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটে প্রাণ হারান তিনি। তার মরদেহও আর খুঁজে পাননি স্বজনরা।
মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন নিজের অজান্তেই বিদায়ের বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন ফাহিম। ফেসবুকে শেষ পোস্টে লিখেছিলেন-
“বোকা-সোকা আম্মু টাই দিনশেষে আমার জন্য কাঁদে, মন খারাপ করে, মন ভরে দোয়া করে!”
একটি ভিডিওতে মানিব্যাগে রাখা মায়ের ছবি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, দেশে থাকতে কখনো নিজের হাতে এক গ্লাস পানিও খাননি, অথচ প্রবাসের কঠিন বাস্তবতা তাকে বদলে দিয়েছে। সেই কথাগুলো আজ আরও বেশি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
ফাহিম সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কবির নগর গ্রামের বাসিন্দা। সৌদি প্রবাসী বাবা ফয়েজ উদ্দিন ও মা হেলেনা বেগমের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় কিছুদিন আগে লিবিয়ায় যান। সেখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার লক্ষ্যে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথ বেছে নেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজন অভিবাসনপ্রত্যাশীর সঙ্গে একটি নৌকায় করে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ফাহিম। কিন্তু মাঝপথে দিকভ্রান্ত হয়ে নৌকাটি ছয়দিন সাগরে ভাসতে থাকে। বৈরী আবহাওয়া, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সঙ্গে লড়াই করেই শেষ পর্যন্ত নিভে যায় তার জীবন।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তার মা হেলেনা বেগম। আহাজারি করে তিনি বলেন, “আমার বুকের ধনকে আমি আর ফিরে পাবো না, আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা ফয়েজ উদ্দিন। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিংহ বলেন, “এ ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। একটি সম্ভাবনাময় তরুণের জীবন এভাবে ঝরে পড়া গভীর বেদনার।” তিনি শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে তাদের বাড়িতে যান।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সমাজে ইউরোপে গেলেই স্বপ্নপূরণ হবে, এই ধারণা বদলাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এ ধরনের যাত্রা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”
ফাহিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং দেশের অসংখ্য তরুণের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রবণতার নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এলো।
বাংলাধারা/এসআর
