প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৭:৩৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মিরপুরে ছোট্ট পরিবার নিয়ে বসবাস করেন নাসরিন বেগম। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পরই শুরু হয় তার এক অদৃশ্য যুদ্ধ- দুই সন্তানের টিফিন, স্বামীর নাস্তা ও দুপুরের খাবারের আয়োজন। কিন্তু রান্নার চুলায় আগুন জ্বালানোই যখন অনিশ্চিত, তখন নিত্যদিনের এই কাজগুলোই হয়ে উঠেছে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ভোরের দিকে গ্যাসের চাপ সামান্য বাড়লেও সূর্য ওঠার আগেই তা আবার কমে যায়। দেশলাইয়ের কাঠি ঘষে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেন নাসরিন। ফস করে আগুন জ্বলে ওঠে, দুই-এক সেকেন্ড পরেই নিভে যায়। আবার দেশলাই, আবার চেষ্টা- কখনও আগুন জ্বলে, কখনও নিভে যায়। এভাবেই কেটে যায় রান্নার জন্য বরাদ্দ সময়।
নাসরিনের স্বামী মোতাহার হোসেন একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাসায় ইলেকট্রিক চুলা থাকলেও সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করার সামর্থ্য নেই। গত মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৩ হাজার ২০০ টাকা। বিলের কাগজ হাতে নিয়ে মোতাহারের মুখ কালো হয়ে যায়।
নাসরিন বলেন, ‘গ্যাস আসে রাত ৩টার দিকে। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি বলছিলেন, অ্যালার্ম দিয়ে উঠে রান্না কইরা রাখি।’
পরামর্শটি মেনে বুধবার রাতে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলেন নাসরিন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে উঠে দেখেন, চুলায় হালকা আগুন জ্বলছে। দেরি না করে ডাল বসিয়ে তার মধ্যে দুটি ডিম দিয়ে দেন। পানি কিছুটা ফুটতেই গ্যাসের চাপ কমে আসে। শেষ পর্যন্ত ডাল-ডিম কোনোটিই ঠিকমতো সেদ্ধ হয়নি।
এটি শুধু নাসরিনের পরিবারের গল্প নয়। রাজধানীর অসংখ্য পরিবার এখন এমনই এক অনিশ্চিত রান্নার সময়সূচির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করা যাচ্ছে না। কোথাও আবার একেবারেই গ্যাস নেই। ফলে কেউ গভীর রাতে উঠে রান্না করছেন, কেউ ইলেকট্রিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকারের ওপর নির্ভর করছেন, আবার নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার লাকড়ি বা মাটির চুলায় রান্নার চেষ্টা করছেন।
রামপুরার গৃহিণী এ্যানী আক্তারও তিতাস গ্যাসের এই সংকটে বিপাকে পড়েছেন। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে রান্না করা প্রায় অসম্ভব। ফলে মাঝরাতে উঠে একসঙ্গে পরদিনের সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার প্রস্তুত করতে হচ্ছে তাকে।
এ্যানী বলেন, রাত ২টার দিকে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ে। তখন কোনোমতে রান্না করে রাখতে হয়। অনেক দিন সকালে হোটেল থেকে নাস্তা কিনে খেতে হয়। আবার কখনও রাতেই রান্না করে রাখা খাবার তিন বেলা ফ্রিজ থেকে বের করে ওভেনে গরম করে খেতে হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই অবস্থা শুধু আমার একার নয়, পুরো এলাকাজুড়েই এমন। গ্যাস নিয়ে যা হচ্ছে, তা বন্ধ করা উচিত। সরকার টোটালি গ্যাস বন্ধ করে দিক, আমরা সিলিন্ডার ব্যবহার করব। তিতাস গ্যাসের বিলও দেব, আবার ব্যাকআপ হিসেবে সিলিন্ডারও রাখব- এটা আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে সম্ভব না।’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ খুবই কম থাকছে। আবার কোথাও মাঝরাতে কিছুটা চাপ বাড়লেও তা দিয়ে প্রয়োজনীয় রান্না শেষ করা যাচ্ছে না।
বাড্ডার গৃহবধূ কানিজ সায়মা বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলা যায়?’
রামপুরার বাসিন্দা বিউটি জানান, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে কোনো রান্নাই করা যায়নি। রাত ৯টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করার মতো চাপ ছিল না।
বাড্ডার শামীমার অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রাখার পরও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিনই বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকট সামাল দিতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছে। কারও কারও রান্না হচ্ছে গভীর রাতে গ্যাসের চাপ বাড়লে। আর নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ লাকড়ি বা মাটির চুলায় রান্নার চেষ্টা করছেন।
তবে বিকল্প ব্যবস্থাও বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তৈরি করছে। যাদের ইলেকট্রিক চুলা আছে, তাদের বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। আর এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের নিয়মিত কিনতে হচ্ছে বাড়তি জ্বালানি। ফলে গ্যাস সংকট শুধু রান্নার ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও।
রাজধানীর অধিকাংশ বাসাবাড়িতে তিতাস গ্যাসের সংযোগ থাকায় সংকটের প্রভাবও পড়ছে ব্যাপক সংখ্যক পরিবারের ওপর। তুলনামূলকভাবে যেসব বাসায় আগে থেকেই এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা রয়েছে, তারা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও তাদের সংখ্যা নগরবাসীর তুলনায় কম।
রাজধানীতে গ্যাসের সংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় কম চাপের অভিযোগ রয়েছে। তবে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও পরবর্তী কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এক্সিলারেট এনার্জির ওই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
আগে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো। বর্তমানে তা ৫০-৬০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। অথচ আগে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার মাত্র প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে আবাসিক খাতের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কমে যাচ্ছে শিল্পের সক্ষমতা। একদিকে বাসাবাড়িতে চলছে রান্নার যুদ্ধ, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় তৈরি হচ্ছে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি মেরামত করে পুনরায় সচল করতে আরও ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগতে পারে। এরই মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের একটি দল স্থানীয় কারিগরি দলের সঙ্গে মিলে টার্মিনালের মেরামতকাজ করছে। আগুনে টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন বলেন, মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে আগে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছিল। কারিগরি ত্রুটির কারণে তা ৬০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। এতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমেছে।
তিনি জানান, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা ত্রুটি সারাতে কাজ করছেন। কিছু সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আনতে হবে। সেগুলো পৌঁছালে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত করে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। ফলে নাসরিন, এ্যানী, কানিজ, বিউটি, শামীমাদের মতো হাজারো পরিবারের কাছে এখন রান্নার চুলা যেন প্রতিদিনের উদ্বেগের জায়গা।
কারও ঘুম ভাঙছে রাত ৩টায়, কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলার সামনে বসে থাকছেন, আবার কেউ বাড়তি টাকা খরচ করে কিনছেন বিকল্প জ্বালানি বা তৈরি খাবার। গ্যাসের এই সংকট তাই এখন আর শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, পারিবারিক ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদন- সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি করছে।
গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলবে কখন- এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই রাজধানীর লাখো পরিবার এখন প্রতিদিনের রান্নার হিসাব মিলিয়ে চলছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন