বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৮:২৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হবে বন্ধ ৪৪ সরকারি কারখানা

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সরকারি ৪৪টি শিল্পকারখানা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি কর্পোরেশনের অধীন এসব কারখানা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, কারখানাগুলো উৎপাদনে ফিরলে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বাড়বে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন এবং নতুন গতি পাবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কারখানাগুলো চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, বেসরকারিকরণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনে ফেরানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদন শুরু করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেশনের অধীন। এর মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

দীর্ঘদিন লোকসান ও নানা জটিলতায় বন্ধ থাকা এসব কারখানা পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশনগুলোতে চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ কারখানাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও শিল্প করিডরের কাছে অবস্থিত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং দক্ষ জনবলকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম সময়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।

সরকারের পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান জমি ও অবকাঠামোকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে ১০ হাজার একরের বেশি জমি।

এসব জমিতে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগসহ নানা অবকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন না থাকায় বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন বলে মনে করছে সরকার।

ইতোমধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব স্থাবর সম্পদের ব্যবসায়িক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। সম্ভাবনাময় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের বিষয়ে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকেও আগ্রহ ও প্রাথমিক পরিকল্পনা পাওয়া যাচ্ছে।

সরকার এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত করে একটি ‘স্টেট-ওনড এন্টারপ্রাইজ (এসওই) ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও’ তৈরির কাজ করছে।

বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে সরকার শুধু সরাসরি বেসরকারিকরণের পথে হাঁটছে না। বরং যৌথ উদ্যোগ (জেভি), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), দীর্ঘমেয়াদি ইজারা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর দায়িত্বের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত, জমি ও অবকাঠামোর সহজলভ্যতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফেরানো সম্ভব।

সরকারি উপস্থাপনায় কয়েকটি প্রকল্পকে বিশেষ সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (পিআইএল) কারখানাটি অন্যতম।

কারখানাটির মোট জমির পরিমাণ ২৪ দশমিক ৭৫ একর। এর মধ্যে প্রায় ১০ একর বর্তমানে অব্যবহৃত। সীমিত পরিসরে গাড়ি সংযোজনের পাশাপাশি সেখানে পূর্ণাঙ্গ অটোমোবাইল উৎপাদন, আধুনিক বডি ও পেইন্ট শপ এবং বৈদ্যুতিক যান বা ইভি সংযোজন লাইন স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি বা জেমকোর ১২২ দশমিক ৯৬ একর জমির একটি বড় অংশও অব্যবহৃত। সেখানে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ট্রান্সফরমার উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছে সরকার। দেশে ট্রান্সফরমারের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ এখন আমদানির মাধ্যমে পূরণ হওয়ায় এই খাতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

টঙ্গীতে অবস্থিত এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯ দশমিক ৬২ একর জমির প্রায় ৬৪ শতাংশই খালি। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাজার দ্রুত বাড়তে থাকায় সেখানে উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে সরকারি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া বগুড়ার ছয়পুকুরিয়ায় বছরে তিন লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার একটি আধুনিক গ্রিন স্টিল মিল স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার বা আইআরআর ১৫ দশমিক ২৬ শতাংশ পাওয়া গেছে বলে সরকারি উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা শিল্পভূমি ও অবকাঠামো আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরবে। নতুন করে শিল্প স্থাপনে জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো তৈরির সময় ও ব্যয় কমবে। পাশাপাশি উৎপাদন শুরু হলে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, কাঁচামাল, বিপণন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব কারখানা চালু হলে রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পায়নের বাইরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হতে পারে। বাড়তে পারে স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের আয়।

বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানা চালু করার উদ্যোগটি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। সে কারণে বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরাতে চলতি মাসেই সংশ্লিষ্ট পাঁচটি কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের ইতোমধ্যে সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সিদ্ধান্তের আওতায় আনা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং কারখানাগুলোর বাস্তব সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যকর বিনিয়োগ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা।

সরকারের লক্ষ্য, বছরের শেষ নাগাদ শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নয়, বাস্তবেই বন্ধ থাকা কারখানাগুলোকে উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্য পূরণ হলে দীর্ঘদিনের লোকসানের বোঝা হয়ে থাকা এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদই নতুন করে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।


বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন