বাংলাধারা বিনোদন

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৮:০১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমার আলো ছড়ানো ববিতা

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কিছু নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ববিতা তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। অভিনয়ের স্বতন্ত্র নৈপুণ্য, সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব আর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু দেশের দর্শকের হৃদয় জয় করেই থেমে থাকেননি; আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনেও বাংলাদেশের সিনেমাকে পরিচিত করেছেন নিজের অভিনয় দিয়ে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই বরেণ্য অভিনেত্রী। আজ ৩০ জুলাই, তার জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে ফিরে দেখা যায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার দীর্ঘ পথচলা, অর্জন আর বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্বের গৌরবগাথা।

১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাটে জন্মগ্রহণ করেন ববিতা। তার প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার পপি। সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। বড় বোন সুচন্দা ও ছোট বোন চম্পাও পরবর্তী সময়ে দেশের চলচ্চিত্রে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ববিতার শোবিজে পথচলা শুরু। বড়পর্দায় প্রথম কাজ জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমায়। যদিও ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তির আলো দেখেনি। এরপর আব্দুল্লাহ আল মামুনের টেলিভিশন নাটক ‘কলম’-এ অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি।

পরে জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় প্রযোজক আফজাল চৌধুরী ও তার স্ত্রীর পরামর্শে ‘ফরিদা আক্তার পপি’ নাম বদলে ‘ববিতা’ রাখা হয়। সেই নামই একসময় হয়ে ওঠে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম।

১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার নায়িকা হিসেবে বড়পর্দায় হাজির হন ববিতা। সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য তখন তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ১২ হাজার টাকা। ছবিটি সাফল্য পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

একটির পর একটি ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দ্রুতই নিজেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রোমান্টিক চরিত্র থেকে শুরু করে সামাজিক ও জীবনঘনিষ্ঠ নানা চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সিনেমার ভাষা, নির্মাণশৈলী ও দর্শকের রুচি; কিন্তু পর্দায় তার উপস্থিতি ও অভিনয়ের গভীরতা তাকে টিকিয়ে রেখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের কাছে।

দেশীয় চলচ্চিত্রে সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ববিতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয় কিংবদন্তি ভারতীয় নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে।

১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার এক নারীর জীবনসংগ্রামকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। তার অভিনয় শুধু বাংলাদেশের দর্শকের কাছেই নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছেও প্রশংসিত হয়।

‘অশনি সংকেত’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও ববিতার অভিনয়কে নতুনভাবে পরিচিত করে। বিশ্বখ্যাত নির্মাতার সিনেমায় অভিনয়ের এই সুযোগ তাকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছেও পৌঁছে দেয়।

বাংলাদেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরির ক্ষেত্রে এই অধ্যায়টি তাই ববিতার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

অভিনয়ের স্বীকৃতিও কম পাননি ববিতা। স্বাধীনতার পর ‘বাদী থেকে বেগম’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এরপর ‘নয়নমণি’, ‘বসুন্ধরা’, ‘রামের সুমতি’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, ‘হাসন রাজা’ ও ‘কে আপন কে পর’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন এই অভিনেত্রী। দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি।

একসময় অসংখ্য পুরস্কার অর্জনের কারণে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাকে ‘পুরস্কার কন্যা’ নামেও অভিহিত করা হতো। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়া শিল্পীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় চলতি বছর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন ববিতা। এ ছাড়া এপ্রিলে রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে তাকে ‘হুজ হু’ সম্মাননাও দেওয়া হয়।

নতুন এই অর্জনগুলো তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য শিল্পীজীবনের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের স্বীকৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ববিতার অবদান শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তার অভিনয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিত করেছে। বিশেষ করে ‘অশনি সংকেত’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের শিল্পীরাও বিশ্বমানের চলচ্চিত্রে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরতে পারেন।

তার পথ ধরে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আরও অনেক শিল্পী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও ববিতা তাই কেবল একজন তারকা নন, বরং একটি অনুপ্রেরণার নাম।

সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্র বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচি, এসেছে নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তারকা। কিন্তু ববিতার জায়গাটি এখনো আলাদা। অভিনয়ের মুনশিয়ানা, ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতার অনন্য সমন্বয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের জন্য তৈরি করেছেন স্থায়ী একটি অধ্যায়।

আজও তাই ববিতার নাম উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গর্ব হিসেবে—যে শিল্পী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের সিনেমার নাম।


 

বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন