বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৯:০৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

নৌপথের নিরাপত্তায় বাংলাদেশসহ ১৩ দেশকে নিয়ে সৌদির নতুন জোট

ছবি: সংগৃহীত

নৌপথের নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষিত রাখতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশকে নিয়ে নতুন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই এ জোটের প্রধান লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে বহুজাতিক এ জোট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করবে।

জোটের সদস্যদেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো নিরাপদ রাখা এবং সংশ্লিষ্ট জলপথে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন এই জোটে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো—তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস।

জোট গঠনের লক্ষ্যে আয়োজিত বৈঠকে ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এ জোটে যোগ দেয়নি। ইরানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটি জোটের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। নিজ নিজ দেশের জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তারা জোটের সনদে স্বাক্ষর করতে পারবে।

নতুন এই জোট গঠনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো বাব এল-মান্দেব প্রণালির ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকি। আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথটি লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগ তৈরি করেছে।

বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের আনুমানিক ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ এ পথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রণালিটির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ২৯ কিলোমিটার। এ কারণে জাহাজ চলাচল নির্দিষ্ট কয়েকটি পথে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সংঘাত বা হামলার মতো ঘটনা ঘটলে জাহাজের নিরাপদ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাব এল-মান্দেবের অপর প্রান্তে রয়েছে সুয়েজ খাল, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ। ফলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব এলাকায় জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সৌদি আরবের জন্যও এ জলপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজের একটি অংশ বাব এল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করে। ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রণালিটি ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বেড়েছে।

গত সপ্তাহে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে ওই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তার তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র ও শোধনাগারকে লোহিত সাগরের তীরের ইয়ানবু টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই পাইপলাইন।

নতুন জোটের আওতায় প্রতিটি দেশ কী ধরনের যুদ্ধজাহাজ, বিমান বা অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা দেবে, তা এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

তবে জোটের কার্যক্রমের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অভিযানগত পরিকল্পনা সমন্বয়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনার বিষয়গুলো থাকবে।

সৌদি আরবের দাবি, এটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক জোট। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এই জোট গঠন করা হয়নি।

জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সৌদি আরবকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর সদর দপ্তরও সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে। তবে কোথায় সদর দপ্তর হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসপিডেস’ নামে একটি নৌ-নিরাপত্তা মিশন আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে। নতুন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বৈঠকে ইইউর প্রতিনিধির উপস্থিতিও ছিল।

ফলে একই অঞ্চলে কার্যরত দুটি উদ্যোগ কীভাবে সমন্বয় করবে কিংবা নতুন জোটটি কী ধরনের অতিরিক্ত ভূমিকা পালন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সৌদি মন্ত্রণালয় বলছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়; এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। অভিন্ন ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় হুমকি মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতাই হবে জোটের মূল ভিত্তি।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পথগুলোর একাধিকটি যখন সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে, তখন সৌদি নেতৃত্বে এই নতুন সামুদ্রিক জোট মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন