ঢাকা, শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

সম্ভাবনা-সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৫, ১০:৪৯ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

দেড় দশকের অনিয়ম আর লুটপাটে ধ্বংসপ্রায় হয়ে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারা থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদী যে, অচিরেই অর্থনীতি আবার মূলধারায় ফিরবে। তবে বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এখনো বড় সংকট হয়ে আছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতি এই মুহূর্তে সম্ভাবনা ও সংকট-দুইয়েরই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এগোতে হলে দরকার কার্যকর নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

গত এক বছরে দেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ও উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে রিজার্ভ প্রায় ৩০ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বেশি। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে, এমনকি বৈদেশিক লেনদেনের অবস্থাও আগের তুলনায় অনেক ভালো। দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পর মুদ্রা বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং ডলার বাজারেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি একাধিক দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা সরকারের লক্ষ্য থেকে অনেক বেশি। একইভাবে বেকারত্বও বেড়েছে; দেশে এখন প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বেকার। কর্মসংস্থান না বাড়ায় নতুন শ্রমশক্তি যুক্ত হওয়ার বদলে অনেকে কাজ হারাচ্ছেন।

প্রবৃদ্ধির হারও এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের মন্থরতার কারণে বিনিয়োগের হারও কমে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে। দেশজ সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও ধীর হয়ে গেছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কম হচ্ছে এবং শ্রমবাজারে চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে।

ব্যাংক খাতের অবস্থাও সংকটজনক। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি আর মূলধন ঘাটতি ক্রমেই নতুন রেকর্ড গড়ছে। এতে দেশের ঋণমান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে সমস্যার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ কিস্তি শিগগিরই শুরু হবে, ফলে আগামী কয়েক বছরে এ চাপ আরও বাড়বে।

অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে এক সময় অস্থিরতা দেখা দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে, দৈনিক লেনদেন আবারও হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে এবং বাজার মূলধনও বেড়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনো অস্থিরতা রয়ে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে কর্মকর্তাদের আন্দোলন রাজস্ব সংগ্রহে প্রভাব ফেলেছে। যদিও সরকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবু এই অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক খাতে অগ্রগতি যেমন আশার সঞ্চার করছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, বিনিয়োগ ও সঞ্চয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতকে সুসংহত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে রাখা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় থাকলেও আগের তুলনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এ সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলেই অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে এবং আবারও দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান টাইগার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

বাংলাধারা/এসআর