জাল টাকা উদ্ধার না ক্ষমতার লড়াই: ডিবির ভেতরে টাকার হিসাব নিয়ে তোলপাড়
প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৪, ২০২৬, ১১:৪১ দুপুর
ছবি: সংগৃহিত
পুরান ঢাকার ওয়ারীতে জাল টাকা উদ্ধারের একটি অভিযান ঘিরে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তেজগাঁও বিভাগে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ, জব্দ তালিকা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিভাগের ভেতর দুটি পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। একপক্ষের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অবৈধ নির্দেশ অমান্য করায় তারা প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। অপর পক্ষের পাল্টা দাবি, অভিযানের আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে এক সোর্সকে অপহরণ, হোটেল কক্ষে আটকে রাখা এবং পরে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।
ডিবি সূত্র, ঘটনার সাধারণ ডায়েরি এবং পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দিদারুল ইসলাম দিদার নামে এক সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ নভেম্বর ডিবির তেজগাঁও বিভাগের একটি দল পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার জুড়িয়াটুলীর একটি ফ্ল্যাটে জাল টাকা উদ্ধারে অভিযান চালায়। অভিযানে ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল মুদ্রা এবং ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। অভিযানের মাঝপথে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান অভিযান বন্ধ করে দলটিকে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। তবে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সহকারী কমিশনার তারেক সেকান্দার ওই নির্দেশকে অবৈধ বলে মনে করে অভিযান অব্যাহত রাখেন।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে ডিসি রাকিব খান উদ্ধার হওয়া ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার মধ্যে ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা জব্দ তালিকায় দেখানোর নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশও মানেননি অভিযানের সদস্যরা। তারা জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় দুজনকে আটক করে নিয়ম অনুযায়ী মামলা দায়ের করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ডিবির ভেতরে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।
ওই সময় মোহাম্মদ রাকিব খান ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে অতিরিক্ত উপকমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন এবং একই সঙ্গে তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি হিসেবে কাজ করছিলেন। পরে গত ৫ জানুয়ারি তাকে সিটিটিসির সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগে বদলি করা হয়। অন্যদিকে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এসি তারেক সেকান্দার পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হন এবং বর্তমানে রাঙামাটি জেলা পুলিশে কর্মরত।
এই অভিযানের সূত্র ধরেই সামনে আসে আরও বিস্ফোরক তথ্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযানের সোর্স দিদারুল আলম দিদারকে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে তুলে এনে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার গিভেন্সি হোটেলের ৮০৫ নম্বর কক্ষে তিন দিন আটকে রাখা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ডিবির তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই আটকের নির্দেশ দেন।
ঘটনাটি গড়ায় পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত। একাধিক অভিযোগ জমা পড়ার পর ডিবির পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির ভেতরে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ওয়ারীর ওই অভিযানে ডিবির একাধিক সদস্য দাবি করেছেন, উদ্ধার হওয়া টাকার একটি অংশ সরিয়ে রাখা এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ আসে ডিসি রাকিব খানের কাছ থেকে। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া এসি তারেক সেকান্দার সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। তার ভাষায়, পুরো বিষয়টি চেপে যাওয়ার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং আইন অনুযায়ী মামলা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এরপরই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ডিসি রাকিব খান এবং অভিযানের সোর্স দিদারকে তুলে এনে আভিযানিক দলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে এসি তারেক সেকান্দার পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ডিসি তাকে অভিযান শুরুর আগের পুরো বিষয় এড়িয়ে যেতে বলেছিলেন। তিনি সেটিকে অবৈধ জানিয়ে অস্বীকৃতি জানান। এরপর মামলার পর ডিসির কক্ষে গেলে তাকে হুমকি দেওয়া হয় যে বেশি বুঝতে গেলে চাকরি থাকবে না।
অভিযানে থাকা ডিবির সদস্যরাও জানিয়েছেন, তারা এসির নির্দেশ মেনে চলায় ডিসির রোষানলে পড়েন। অভিযানের পর তাদের কক্ষে ডেকে এনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং পরিবারকে জড়িয়ে হুমকি দেওয়া হয়।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই গত ২৯ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কোর্টবাজার এলাকা থেকে দিদারুল আলম দিদারকে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। তিন দিন পর তার স্ত্রী মমতাজ বেগম উখিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে পরিবার জানতে পারে, দিদারকে কারওয়ান বাজারের গিভেন্সি হোটেলে আটকে রাখা হয়েছে। উখিয়া থানা ও ৯৯৯–এ ফোন করার পর তেজগাঁও থানার একটি টহল দল ১ ডিসেম্বর গভীর রাতে হোটেল থেকে দিদারকে উদ্ধার করে। তবে উদ্ধার শেষে তাকে পরিবারের কাছে না দিয়ে ডিবি কর্মকর্তারা জোর করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যান। চার দিন পর তাকে উখিয়া থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হোটেল গিভেন্সির রেজিস্টার বইয়ে দিদারের নাম লেখা ছিল ‘মিস্টার দিদার’। রেফারেন্স কলামে লেখা ছিল ‘ডিবি’ এবং ‘জিএম স্যার’। রেজিস্টার অনুযায়ী, তিনি সেখানে ছিলেন ৩০ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কক্ষ ভাড়ার টাকা পরিশোধ করা হয় ৭ হাজার টাকা।
হোটেল ব্যবস্থাপক জানান, কামরুল নামে এক ব্যক্তি ডিবির পরিচয়ে ফোন করে কক্ষ বরাদ্দ দিতে বলেন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, কামরুল নামের ওই ব্যক্তি ডিবির তেজগাঁও বিভাগে কর্মরত এক উপপরিদর্শক। যদিও তিনি ফোনে এই বিষয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দিদারকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া তেজগাঁও থানার এসআই গিয়াস বলেন, তারা হোটেলে গিয়ে ডিসি রাকিব খানকে সামনে পেয়েছেন এবং পরে দিদারকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, দিদারের পরিবারকে উখিয়া থানায় করা জিডি এবং ডিএমপি কমিশনারের কাছে দেওয়া অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। এ সময় ডিবির জিডি বইয়ের কিছু অংশ ফাঁকা রাখা হয়, যা পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী আইনসিদ্ধ নয়। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, অবৈধ আটককে বৈধতা দিতে এ ধরনের কৌশল কখনো কখনো ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, তিনি কোনো অবৈধ আদেশ দেননি এবং অভিযানের নামে অপকর্ম করেছে আভিযানিক দল। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তাধীন এবং টিমের দুজন সদস্যকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যদিকে তিনি নিজেও এসি তারেক সেকান্দারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। সেই অভিযোগ তদন্তে ডিবির পক্ষ থেকে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পুরান ঢাকার ওয়ারীর ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে কথা বলা স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, অভিযানের সময় তাদের সামনে জাল টাকা ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। কত টাকা ছিল, তা তারা নির্দিষ্ট করে বলতে না পারলেও জাল ও আসল টাকা দুটোই উদ্ধার হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেন।
জাল টাকা উদ্ধারের একটি অভিযানে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্ব এখন শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। সোর্স অপহরণ, হোটেল কক্ষে আটক, জিডি বই ফাঁকা রাখা এবং পুলিশের ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ মিলিয়ে ঘটনাটি ডিবির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বাংলাধারা/এসআর
